১.
সংসার নামক যজ্ঞশালায় কত মানুষ যে আজীবন কেবল কাঠ জুগিয়ে যায় আর কত মানুষ সেই যজ্ঞের আগুনে পরম আয়েশে হাত সেঁকে নেয়, তার কোনো নিখুঁত খতিয়ান বিধাতাও হয়তো রাখেন না। সংসার তো কেবল চারখানা চুন-সুরকির দেওয়াল আর কতকগুলো রক্তমাংসের মানুষের সহাবস্থান নয়; সংসার হলো এক অদৃশ্য রজ্জু, যার এক মাথায় বাঁধা থাকে অনন্ত ত্যাগ আর অন্য মাথায় পরম নিশ্চিন্তির আত্মস্বার্থ। সেই রজ্জুর টান যখন কোনো একপক্ষের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ভারী হয়ে ওঠে, তখনই সৃষ্টি হয় এক নিঃশব্দ হাহাকার—যার কোনো সামাজিক আদালত নেই, কোনো লিখিত বিচার নেই।
পুরোনো দোতলা বাড়িটার পশ্চিমের ঘরটায় দুপুরের মরা রোদ এসে তির্যকভাবে পড়েছে মেহগনি কাঠের ভারী আলমারির ওপর। আলমারির পাল্লায় লাগানো আয়নাটায় এখন আর স্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখা যায় না; একধরনের কালচে শ্যাওলাটে দাগ আয়নার বুক চিরে আড়াআড়ি নেমে গেছে। সেই দাগটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল শাহানা।
শাহানার পরনে একটি অতি সাধারণ তাঁতের শাড়ি, চুলে আলগা করে বাঁধা একখানা সাধারণ খোঁপা। তার বয়স তিরিশের কোঠা ছুঁইছুঁই। মুখের গড়নে সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি প্রকট এক আশ্চর্য রকমের শান্ত কাঠিন্য। যে কাঠিন্য কোনোদিন সহজে কারো করুণা ভিক্ষা করতে শেখেনি, আবার নিজের অধিকার দাবি করতে গিয়েও কখনো লোকলৌকিকতার সীমা অতিক্রম করেনি।
মেঝের ওপর খোলা পড়ে ছিল একখানা চামড়ার সুটকেস। সুটকেসের ভেতর গুছিয়ে রাখা পরিপাটি ইস্ত্রি করা শার্ট, বিলিতি পশমি কোট আর কিছু জরুরি নথিপত্র।
ইরফান সুটকেসের ডালাটা বন্ধ করার আগে একবার ড্রয়ারের চাবিটার দিকে হাত বাড়াল। ইরফানের অবয়বে কোনো অপরাধবোধ নেই, নেই কোনো চাঞ্চল্য। ত্রিশোর্ধ্ব এই পুরুষটির চোয়ালে এক ধরনের কঠিন, বৈষয়িক হিসেবের ছাপ স্পষ্ট। সে জীবনের সমস্ত অংক কষে দেখেছে লাভ-ক্ষতির দাঁড়িপাল্লায়; যেখানে ভাবাবেগের স্থান নেই, কেবল আছে নিজের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুপরিকল্পিত ছক।
শাহানা দরজার চৌকাঠে হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখ ইরফানের হাতের প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছিল বটে, কিন্তু চোখের পাতায় কোনো জল নেই, কোনো অনাবশ্যক কম্পন নেই।
“তুমি তবে চলে যাচ্ছো?”
“থাকতে বলছো?”
“বললে শুনবে বোধ হয়?”
“বোধ হয় না!”
“তবে অহেতুক মিথ্যে আশা রাখবো?”
“বলেছি?”
“নাহ তা বলোনি, তবে আর কটাদিন থাকলে হতো না ইরফান?”
“নাহ।”
কথোপকথন শেষ হতেই ঘরের ভেতর নেমে এল এক জমাট বাঁধা নিস্তব্ধতা। এই নিস্তব্ধতা কোনো নতুন ঘটনা নয়; গত তিন বছর ধরে এই বাড়িতে কথার চেয়ে নীরবতার বিস্তারই বেশি ঘটেছে।
ইরফান সুটকেসের ডালাটা শক্ত হাতে চেপে ধরে ‘খট’ করে দুটো পিতলের লক এঁটে দিল। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল।
“আগামীকাল সকাল আটটায় আমার ফ্লাইট। আজ বিকেলেই আমাকে ঢাকার মূল শহরে পৌঁছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে উঠতে হবে। সেখানে কোম্পানির ডিরেক্টরদের সাথে ডিনার আছে।”
শাহানা শান্ত গলায় বলল, “জানি। তোমার জীবনের প্রতিটা সেকেন্ডের তো একটা সুনির্দিষ্ট মূল্য আছে। সেই মূল্যের তালিকা থেকে কয়েকটা দিন এই ভাঙা বাড়ির জন্য অপচয় করা নিশ্চয়ই বোকামি।”
ইরফান ভ্রু কুঁচকাল। তার চোখে কোনো আক্রোশ ফুটল না, কেবল এক ধরনের অহংকারী যুক্তি জেগে উঠল।
“তুমি কথাগুলোকে সবসময় একটা আবেগের মোড়কে মুড়িয়ে দেখতে ভালোবাসো শাহানা। বাস্তবতা বড় রুঢ়। আমি জার্মানির এই প্রজেক্টটা ফেলে রেখে যদি এখানে বসে পৈতৃক সম্পত্তির ভাগাভাগি আর মেজচাচা-ছোটচাচার খেয়োখেয়ি দেখতে থাকতাম, তবে আমার ক্যারিয়ার বলে কিছু অবশিষ্ট থাকত না।”
“আমি তো তোমার ক্যারিয়ার ছাড়তে বলিনি ইরফান। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম—এই যে অসুস্থ আম্মা বিছানায় পড়ে আছেন, ফারজানার বিয়ের সমস্ত আয়োজন মাঝপথে থমকে আছে, আর এই পুরোনো ভিটেটার শরিকি মামলার বোঝা—এগুলো কার দায়িত্বে রেখে যাচ্ছ?”
ইরফান সুটকেসটা মেঝে থেকে তুলে খাটের পাশে রাখল।
“দায়িত্ব তো সবারই শাহানা। মেজচাচা আছেন, ছোটচাচা আছেন। তারা বড়দের মতো সিদ্ধান্ত নেবেন। আর টাকা-পয়সার কথা যদি বলো, আমি তো প্রতি মাসেই ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটা অঙ্ক পাঠিয়ে দেব।”
শাহানার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তীব্র, তীক্ষ্ণ হাসির রেখা ফুটে উঠল—
“টাকা পাঠাবে? বাহ্! কত চমৎকার সমাধান! তুমি জার্মানিতে বসে ব্যাংকে টাকা জমা দেবে, আর আমি এখানে বসে মেজচাচার কটু কথা শুনব, অসুস্থ শাশুড়ির সেবা করব, আর ফারজানার শ্বশুরবাড়ির লোকের কাছে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকব। পুরুষের দায়িত্ব কত সহজে কাগজের চেকে মিটে যায় ইরফান, আর নারীর দায়িত্বকে তোমরা বানিয়ে রাখো আমৃত্যু দাসত্বের এক অলিখিত চুক্তি!”
ইরফানের মুখ এক মুহূর্তের জন্য সামান্য বিবর্ণ হলো। কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল দ্রুত। এই মেয়েটির মুখের ওপর কথা বলার ক্ষমতা তার কোনোদিনই ছিল না। শাহানা সাধারণ মেয়েদের মতো কান্নাকাটি করে আঁচল ভেজায় না; সে এমন নির্মোহ সত্য উচ্চারণ করে যা পুরুষতান্ত্রিক অহংকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
ইরফান হাতঘড়ির দিকে তাকাল।
“আমার সাথে তর্কে গিয়ে কোনো লাভ নেই। গাড়ি চলে আসবে একটু পরেই। আমি আম্মার ঘরে যাচ্ছি।”
ইরফান দীর্ঘ পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার জুতোজোড়ার খটখট শব্দ বারান্দা পেরিয়ে দূরের ঘরের দিকে মিলিয়ে গেল। শাহানা জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে তখন দুপুরের রোদ মরে গিয়ে এক ফালি মেঘলা ছায়া নামছে উঠোনের প্রাচীন জাম্বুরা গাছটার ওপর।
★
২.
এই পুরোনো দালানটার ইতিহাস বহু যুগের। চুন-সুরকির গাঁথুনিতে তৈরি দেয়ালগুলো আজ জীর্ণ, নোনাধরা প্লাস্টার খসে পড়ে লাল ইটের কঙ্কাল উঁকি দিচ্ছে। একসময় এই চৌধুরী বাড়িতে মানুষের আনাগোনা আর নহবতের শব্দে গমগম করত। কিন্তু কালক্রমে সেই বনেদি আভিজাত্য ক্ষয়ে গিয়ে এখন পড়ে রয়েছে কেবল কতকগুলো অন্তঃসারশূন্য অহংকার আর জটিল হিসেবের মারপ্যাঁচ।
ইরফানের বাবা ইকবাল চৌধুরী ছিলেন সহজ-সরল মানুষ। ভাইয়ের ওপর বিশ্বাস করে সমস্ত সম্পত্তি যৌথ ব্যবসায় খাটিয়েছিলেন। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছিল—ব্যবসায় লোকসান দেখিয়ে মেজভাই বদরুদ্দিন চৌধুরী নিজের নামে শহরের জমি কিনে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন, আর ইকবাল চৌধুরী রেখে গিয়েছিলেন একগাদা দেনা আর পৈতৃক ভিটের জটিল মামলা।
ইকবাল চৌধুরীর মৃত্যুর পর ইরফান ছিল এই সংসারের একমাত্র পুরুষ প্রতিনিধি। কিন্তু ইরফান বরাবরই নিজেকে এই পারিবারিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে এক ‘আন্তর্জাতিক নাগরিক’ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে স্কলারশিপ নিয়ে ইউরোপ যাত্রা, তারপর সেখানে বহুজাতিক সংস্থায় বড় চাকরি—ইরফানের জীবনে কোনো পিছুটান ছিল না।
আর সেই পিছুটান না থাকার একমাত্র কারণ ছিল—শাহানা।
পাঁচ বছর আগে যখন পারিবারিকভাবে শাহানার সাথে ইরফানের বিয়ে হয়, তখন শাহানা ভেবেছিল সে এক সহযাত্রী পাবে যার সাথে জীবনের সমস্ত আলো-ছায়ার ভাগ নেওয়া যাবে। কিন্তু বিয়ের বছর না ঘুরতেই ইরফান যখন প্রথমবার বিদেশে চলে যায়, তখন সে শাহানাকে সাথে নেওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি। তার যুক্তি ছিল অত্যন্ত পরিপাটি—‘সেখানে সেটেল হতে সময় লাগবে, তাছাড়া দেশের বাড়ি আর অসুস্থ আম্মাকে দেখবে কে?’
সেই থেকে শুরু। শাহানা এই পাঁচ বছরে হয়ে উঠল এই বাড়ির প্রধান খুঁটি। অথচ সেই খুঁটির নিজের কোনো অস্তিত্ব সমাজ স্বীকার করেনি। সে ছিল শুধুই ‘ইরফানের বউ’, যার কাজ হলো বাড়ির সবাইকে ভালো রাখা, পরিবারের মানসম্মান রক্ষা করা, অথচ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যার কোনো ভোটাধিকার নেই।
আমেনা খাতুনের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল শাহানা।
আমেনা খাতুন খাটের ওপর আধশোয়া হয়ে বসেছিলেন। তাঁর মাথার বালিশগুলো এলোমেলো, গায়ে একটা পুরোনো ফ্লানেলের চাদর। ইরফান তাঁর বিছানার পাশে একটা টুলে বসে মায়ের হাত ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে কিছু বলছিল।
“তুমি একদম চিন্তা কোরো না আম্মা। আমি ডক্টর আনিসকে বলে রেখেছি, প্রতি সপ্তাহে এসে তোমার প্রেশার আর হার্ট চেক করে যাবে। আর শাহানা তো আছেই।”
আমেনা খাতুন চোখ মুছে বললেন, “ডাক্তার দিয়া কি পেটের ছেলের অভাব মেটে রে ইরফান? তুই যে এত দূরে চলে যাচ্ছিস, আমার এই পোড়া চোখ আর তোকে দেখতে পাবে কি না কে জানে!”
ইরফান একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আহ্ আম্মা! সবসময় এমন অমঙ্গলের কথা কেন বলো? আমি তো আর চিরতরে যাচ্ছি না। এক বছর পরেই তো ছুটি নিয়ে আসব।”
“এক বছর? একটা বছর কি মুখের কথা রে বাপ? কত দিন, কত রাত!”
আমেনা খাতুনের চোখ গিয়ে পড়ল দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা শাহানার ওপর। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের সুর কিছুটা বদলে বললেন,
“বউমা, তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে কেন? ইরফানের জন্য একটু নাশতার জোগাড় করো। মেজভাই আর ছোটভাই বৈঠকখানায় বসে আছেন, ওঁদেরও তো এক কাপ চা দেওয়া দরকার।”
শাহানা কোনো কথা না বলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। এই হলো এই সংসারের অলিখিত নিয়ম। মা ছেলের বিচ্ছেদে শোক প্রকাশ করবেন, ছেলে নিজের ক্যারিয়ারের স্বপ্নে বিভোর থাকবে, আর সমস্ত লৌকিকতা, আপ্যায়ন আর দায়িত্বের চাকা ঘোরাতে হবে ঘরের বউটিকে। শাহানার মনে মনে প্রশ্ন জাগল—এই যে সে প্রতিদিন নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দিয়ে এই পরিবারের জন্য খেটে মরছে, এর নাম কি কর্তব্য? নাকি নেহাতই এক দাসত্ব, যাকে সমাজ ‘দায়’ বলে মহিমান্বিত করে রেখেছে?
★
৩.
বৈঠকখানায় তখন এক তুমুল বাকযুদ্ধ চলছিল।
মেজচাচা বদরুদ্দিন চৌধুরী একখানা চুরুট ধরিয়ে আয়েশ করে ধোঁয়া ছাড়ছিলেন। তাঁর মুখে এক ধরনের কুটিল ধূর্ততার হাসি। পাশে বসা ছোটচাচা আসাদুল্লাহ চৌধুরী, যিনি পেশায় আইনজীবী হলেও সারাজীবন মামলা হেরে হেরে মেজাজটা খিটখিটে করে ফেলেছেন।
ইরফান বৈঠকখানায় ঢুকতেই বদরুদ্দিন সাহেব চুরুটটা অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে বললেন,
“এসো বাবা ইরফান, বোসো। তোমার যাওয়ার সময় তো হয়ে এল। তা শেষ পর্যন্ত সম্পত্তির বণ্টনের দলিলটায় সই করে যাচ্ছ তো?”
ইরফান গম্ভীর হয়ে বসল।
“আমি তো বলেছি মেজচাচা, সামনের রাস্তার দিকের জমিটুকু ফারজানার বিয়ের খরচের জন্য বিক্রি করতে হবে। ওটাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
আসাদুল্লাহ সাহেব টেবিল চাপড়ে উঠলেন, “আপত্তি নেই বললেই তো হলো না ভায়া! সামনের রাস্তার জমিটা তো আমার অংশের সাথে যুক্ত। পেছনের ডোবাওয়ালা জমিটা বিক্রি করো না কেন?”
ইরফান শান্ত গলায় বলল, “পেছনের জমি কেউ কিনতে চাইছে না ছোটচাচা। আর ফারজানার সম্বন্ধটা এসেছে এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে। ওরা কোনো পণ দাবি করেনি ঠিকই, কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানটা তো মানসম্মত হতে হবে।”
বদরুদ্দিন সাহেব মুচকি হাসলেন, “তা মানসম্মত করার দায় কি শুধু আমাদের? তোমার বাপ তো কোনো সঞ্চয় রেখে যাননি। আমরা নিজেদের পকেট থেকে কত দেব? তুমি তো এখন বিলেতের বড় সাহেব, লাখ লাখ টাকা আয় করছ। তুমিই দশ-বিশ লাখ টাকা পাঠিয়ে ফারজানার বিয়েটা পার করে দাও না!”
ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“আমি যতটুকু পারি সাহায্য করব মেজচাচা। কিন্তু আমারও নিজের একটা জীবন আছে, ভবিষ্যৎ প্ল্যান আছে। আমি সারাজীবন এই পরিবারের পুরোনো ঋণ শোধ করতে পারব না।”
ঠিক তখনই ট্রে-তে করে চায়ের কাপ আর বিস্কুট নিয়ে বৈঠকখানায় ঢুকল শাহানা।
পুরুষদের উত্তপ্ত কথাবার্তা এক নিমেষে থমকে গেল। বদরুদ্দিন সাহেব একটু নড়েচড়ে বসলেন। এই পরিবারে শাহানাকে সবাই একটু সমঝে চলে, কারণ শাহানার চাউনিতে এমন একধরনের ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে যা কোনো অন্যায্য চাপকে সহ্য করে না।
শাহানা অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে টেবিলের ওপর চায়ের কাপগুলো নামিয়ে রাখল। তারপর সে সোজা বদরুদ্দিন সাহেবের চোখের দিকে তাকাল।
“মেজচাচা, একটা কথা বলব?”
বদরুদ্দিন সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, “কী কথা বউমা?”
“ফারজানার বিয়ের জন্য পেছনের ডোবা জমিটা বিক্রি করার প্রস্তাব আপনারা দিচ্ছেন, অথচ আপনারা ভালো করেই জানেন ওই জমি কেনার মতো কোনো ক্রেতা এই মুহূর্তে নেই। ইরফান বিদেশে যাচ্ছে নিজের যোগ্যতায়, ওর উপার্জনের ওপর আপনাদের এই বাড়তি দাবি কতটা ন্যায়সঙ্গত?”
আসাদুল্লাহ সাহেব চোখ গরম করে বললেন, “বউমা! তুমি পরিবারের পুরুষদের হিসেব-নিকেশের ভেতর কথা বলছ কেন?”
শাহানা একচুলও নড়ল না। তার কণ্ঠস্বর ছিল সম্পূর্ণ নিচু, কিন্তু প্রতিটি শব্দে ছিল অকাট্য যুক্তি।
“কথা বলছি ছোটচাচা, কারণ এই পুরুষদের হিসেব-নিকেশের শেষ বলিটা হতে হয় আমাকে। ইরফান চলে যাবে কাল সকালে। তারপর ফারজানার বিয়ের দেনদরবার থেকে শুরু করে এই বাড়ির চালের হিসেব পর্যন্ত মেলাতে হবে আমাকেই। যে দায় আমাকে বহন করতে হবে, সেই দায়ের সিদ্ধান্তের টেবিলে কথা বলার অধিকার আমার নিশ্চয়ই আছে।”
বৈঠকখানার বাতাস যেন এক নিমেষে ভারী হয়ে উঠল। বদরুদ্দিন চৌধুরী চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বললেন, “বড় মুখের বড় কথা! আজকালকার মেয়েদের এই এক দোষ, বড়দের মুখের ওপর তর্ক করে।”
শাহানা শান্ত চোখে তাকাল।
“তর্ক নয় মেজচাচা, সত্যি কথা। সত্যি কথা সবসময় অপ্রিয় হয়। আপনারা চা শেষ করুন।”
শাহানা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ধীরপায়ে বৈঠকখানা ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ইরফান নিঃশব্দে শাহানার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, এই মেয়েটি কোনো সাধারণ মাটির পুতুল নয়; এ এক অনন্যসাধারণ সত্তা, যাকে কোনো সামাজিক ভণ্ডামির শিকলে কোনোদিনই পুরোপুরি বেঁধে ফেলা যাবে না।
★
৪.
বিকেল নামতেই আকাশে মেঘের ঘনঘটা বাড়ল। কার্তিক মাসের শেষে এমন মেঘলা আবহাওয়া সচরাচর দেখা যায় না। বাতাসের মধ্যে একটা হিমেল স্পর্শ, গাছের পাতাগুলো কেমন যেন শুকনো শব্দ করে ঝরে পড়ছে উঠোনে।
সদর দরজার সামনে একটা সাদা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল। হর্ন দিল দুবার—‘প্যাঁক… প্যাঁক…’।
ইরফানের সুটকেস আর ব্যাগ গাড়ির পেছনের ডিকিতে তোলা হয়ে গেছে। বাড়ির সবাই এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দায়। আমেনা খাতুন আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদছেন। ফারজানা তার ভাইয়ের হাত ধরে নিচু গলায় বলছে, “ভাইয়া, পৌঁছেই ফোন দিয়ো।” ছোটচাচা আর মেজচাচা বারান্দার থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিক শুভকামনা জানাচ্ছেন।
ইরফান সবার সাথে দেখা শেষ করে এসে দাঁড়াল শাহানার সামনে।
শাহানা দাঁড়িয়ে ছিল সিঁড়ির শেষ ধাপে। তার গায়ে একটা হালকা চাদর জড়ানো। তার চোখে কোনো অশ্রু নেই, কোনো আকুলতা নেই। যেন এই বিদায় কোনো বিচ্ছেদ নয়, নিতান্তই এক প্রাত্যহিক ঘটনা।
ইরফান পকেট থেকে একটা চাবির তোড়া আর একটি খাম বের করল।
“শাহানা, এটা আলমারির খাস ড্রয়ারের চাবি। আর এই খামে পঞ্চাশ হাজার টাকা আছে ফারজানার বিয়ের প্রাথমিক কেনাকাটার জন্য। বাকি টাকা আমি ঢাকা পৌঁছে ব্যাংক মারফত পাঠিয়ে দেব।”
শাহানা হাত বাড়িয়ে খাম আর চাবিটা নিল। তার আঙুলের সাথে ইরফানের আঙুলের কোনো স্পর্শ ঘটল না।
“টাকাটা আমি যত্ন করে রাখব।”
ইরফান এক মুহূর্ত ইতস্তত করল। তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
“তুমি কিছু বললে না শাহানা?”
শাহানা মুখ তুলে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো অভিযোগ নেই, কেবল এক সীমাহীন প্রশান্তি।
“কী বলব ইরফান? যা বলার ছিল, তা তো আগেই বলা হয়ে গেছে। তুমি তোমার মুক্তির পথে পা বাড়াচ্ছ, আর আমি আমার দায়ের বোঝা কাঁধে তুলে নিচ্ছি। এই দুই পথের মাঝে কথার কোনো সাঁকো তৈরি হতে পারে না।”
“তুমি আমাকে স্বার্থপর ভাবছ?”
“ভাবাভাবির সময় পেরিয়ে গেছে ইরফান। মানুষ যা করে, তা-ই তার আসল পরিচয়। তুমি তোমার নিজের জন্য বাঁচতে চেয়েছ, এটা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু সেই বাঁচার জন্য অন্য কাউকে বন্ধক রেখে যাওয়াটা কতটা পৌরুষের পরিচয়, সেই বিচার সময় করবে।”
ইরফানের চোয়াল শক্ত হলো। সে আর কোনো কথা বলতে পারল না। সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসল।
ড্রাইভার ইঞ্জিন চালু করল। গাড়িটা ধীরে ধীরে পুরোনো দেউড়ি পেরিয়ে বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। ধুলো উড়িয়ে গাড়িটি একসময় মোড়ের মাথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমেনা খাতুন বারান্দায় বসে হাহাকার করে উঠলেন, “আমার সোনার টুকরো ছেলেটা চলে গেল রে!”
ফারজানা কাঁদতে কাঁদতে মায়ের ঘরে গেল। মেজচাচা আর ছোটচাচাও নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
পুরো উঠোনটায় পড়ে রইল কেবল একরাশ ঝরা পাতা আর নিস্তব্ধতা।
শাহানা দাঁড়িয়ে রইল সেই সিঁড়ির ওপর। তার হাতে ধরা সেই টাকার খাম আর চাবির তোড়া। কিন্তু আজ তার বুকের ভেতর কোনো হাহাকার নেই, কোনো দুর্বলতা নেই। মানুষ যখন বুঝতে পারে যে সে সম্পূর্ণ একা, তখন তার ভেতরের সমস্ত পরনির্ভরশীলতার ভয় কেটে যায়।
★
৫.
পরের ছয়টি মাস এই চৌধুরী বাড়ির ইতিহাস যেন সম্পূর্ণ নতুন এক ধারায় প্রবাহিত হলো।
ইরফান ভেবেছিল, সে চলে গেলে এই সংসার অচল হয়ে পড়বে, শরিকি মামলায় জমি বেদখল হয়ে যাবে, আর ফারজানার বিয়ে ভেঙে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল তার ঠিক বিপরীত।
শাহানা কোনোদিন ঘরের বাইরে পা রাখেনি একা। কিন্তু এই ছয় মাসে সে প্রমাণ করল যে একজন নারীর আত্মমর্যাদাবোধ কত বড় শক্তি হতে পারে। সে নিজের বাবার বাড়ি থেকে প্রাপ্ত কিছু ব্যক্তিগত সঞ্চয় এবং নিজের এমএ পাসের সার্টিফিকেট ব্যবহার করে এলাকার একটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার সহকারী হিসেবে চাকরি নিল।
প্রতিদিন সকালে সে স্কুলের দায়িত্ব সামলাত, বিকেলে এসে অসুস্থ শাশুড়ির সেবা করত, আর রাতে বসে ফারজানার বিয়ের কেনাকাটার নিখুঁত বাজেট তৈরি করত।
মেজচাচা বদরুদ্দিন চৌধুরী যখন পেছনের জমি কম দামে নিজের এক ব্যবসায়িক পার্টনারের কাছে বিক্রির পাঁয়তারা করছিলেন, তখন শাহানা একাই গিয়ে দাঁড়াল সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে। সে স্পষ্টভাবে দলিল দেখিয়ে প্রমাণ করল যে ইকবাল চৌধুরীর মৃত্যুর পর এই জমির মূল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আমেনা খাতুনের নামে, এবং উত্তরাধিকার সূত্রে শাহানা ও ফারজানার সম্মতি ছাড়া এই জমি বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ।
বদরুদ্দিন চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সেই অফিসে। তিনি বাড়ি ফিরে এসে রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলেছিলেন, “মেয়েমানুষের এত তেজ ভালো নয়! ইরফানকে সব জানাব আমি!”
শাহানা শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিল, “জানান মেজচাচা। তবে আইন কারো রক্তের সম্পর্ক দেখে না, আইন চলে দলিলের সত্যতায়।”
ফারজানার বিয়ে সম্পন্ন হলো বৈশাখের এক সুন্দর সকালে। কোনো জাঁকজমকপূর্ণ অপচয় হলো না, কিন্তু কোনো অমর্যাদাও হলো না। মার্জিত, সুশৃঙ্খল এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফারজানা শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে বিদায় নিল। পাত্রপক্ষ শাহানার পরিচালন ক্ষমতা আর ব্যক্তিত্ব দেখে মুগ্ধ হয়ে বলে গেল, “এমন ঘরের মেয়ে আমাদের ঘরে নিতে পেরে আমরা ধন্য।”
বিয়ের সমস্ত খরচ চুকিয়ে যখন হিসাবের খাতা বন্ধ করা হলো, তখন দেখা গেল—ইরফানের পাঠানো টাকার বাইরেও শাহানা নিজের চাকরির প্রথম তিন মাসের বেতন সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করেছে এই যজ্ঞে। সে কারো কাছে এক পয়সার জন্যও হাত পাতেনি।
★
৬.
এক বছর পর।
চৈত্র মাসের এক গোধূলিবেলায় আবার সেই সাদা ট্যাক্সি এসে থামল চৌধুরী বাড়ির সদর দরজায়।
ইরফান ফিরেছে। এক বছরের জার্মানি প্রবাস তার চেহারায় এক ধরনের বৈষয়িক ঔজ্জ্বল্য এনে দিয়েছে। গায়ে দামি স্যুট, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, হাতে আধুনিক বিদেশি ট্রলি ব্যাগ। সে আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপে দেউড়ি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল।
সে ভেবেছিল, সে দেখবে এক জীর্ণ, বিধ্বস্ত সংসার—যেখানে সবাই তার ফিরে আসার জন্য হাহাকার করছে।
কিন্তু উঠোনে পা দিয়েই ইরফান থমকে গেল।
উঠোনের সেই নোনাধরা দেয়ালগুলোতে নতুন চুনকামের শুভ্রতা। প্রাচীন জাম্বুরা গাছটার নিচে পরিপাটি করে বাঁধানো বেদি। বসার ঘরে আমেনা খাতুন একটি নতুন আরামকেদারায় বসে শান্ত মুখে কোরআন তেলাওয়াত করছেন। তাঁর মুখে আগের সেই রুগ্ণ, ভয়ার্ত ভাব নেই; এক পরম স্বস্তির আভা।
ইরফান ঘরে ঢুকল।
“আম্মা!”
আমেনা খাতুন চোখ তুলে তাকালেন। তাঁর চোখে আনন্দ ফুটল ঠিকই, কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যে কোনো অন্ধ নির্ভরতার ব্যাকুলতা ছিল না।
“ইরফান? এসেছিস বাবা? বোস।”
ইরফান সোফায় বসে চারপাশটা দেখল।
“আম্মা, বাড়িটা তো বেশ বদলে গেছে দেখছি। মেজচাচা আর ছোটচাচার সেই মামলার ঝামেলা মিটেছে?”
আমেনা খাতুন শান্ত গলায় বললেন, “সব মিটে গেছে রে বাপ। মেজভাই নিজের অংশ বুঝে নিয়ে আলাদা পাঁচিল তুলে নিয়েছেন। আমাদের অংশের জমিটুকু এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ। আর ফারজানাও শ্বশুরবাড়িতে খুব সুখে আছে। গত সপ্তাহেই জামাইকে নিয়ে এসে ঘুরে গেল।”
ইরফান বিস্মিত হয়ে বলল, “এসব কীভাবে সম্ভব হলো? আমি তো ভেবেছিলাম আমি না থাকলে…”
“তুই না থাকলে পৃথিবী থেমে থাকে না ইরফান।”
দরজার পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল শাহানা।
পরনে তার একটি মার্জিত নীল সুতির শাড়ি। হাতে স্কুলের ফাইল আর হাতে কিছু পরীক্ষার খাতা। শাহানার চোখেমুখে আগের সেই গৃহকোণের ক্লান্তি নেই; সেখানে জ্বলজ্বল করছে এক স্বাধীন, স্বাবলম্বী নারীর অপরাজেয় দীপ্তি।
ইরফান উঠে দাঁড়াল। সে শাহানার দিকে এক মুহূর্ত অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। এই শাহানা যেন সেই পুরোনো শাহানা নয়। এই নারী অনেক বেশি দৃঢ়, অনেক বেশি স্বয়ংসম্পূর্ণ।
“কেমন আছ শাহানা?” ইরফানের গলার স্বরে এক ধরনের অবচেতন দ্বিধা।
শাহানা ফাইলগুলো টেবিলের ওপর রেখে শান্ত গলায় বলল,
“ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন ইরফান সাহেব?”
‘ইরফান সাহেব’ সম্বোধনটি ইরফানের বুকে এক অদৃশ্য চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। সে এক পা এগিয়ে এসে বলল,
“তুমি আমাকে এভাবে পর করে কথা বলছ কেন শাহানা? আমি তো ফিরে এসেছি। এবার আমি তোমাকেও জার্মানি নিয়ে যাওয়ার সমস্ত পেপারস রেডি করে এনেছি।”
শাহানা একটু হাসল। সেই হাসিতে কোনো আক্রোশ নেই, আছে এক পরম মুক্তির পূর্ণতা।
“জার্মানি? কেন ইরফান সাহেব? সেখানে গিয়ে আমি কী করব?”
“কী করবে মানে? তুমি আমার স্ত্রী। আমার সাথে থাকবে।”
“স্ত্রী?” শাহানা সোজা ইরফানের চোখের দিকে তাকাল, “যেদিন আপনি এই সমস্ত দায়িত্ব, অসুস্থ মা আর পরিবারের অনিশ্চয়তাকে আমার কাঁধে ফেলে রেখে নিজের ক্যারিয়ারের জন্য একা উড়ে গিয়েছিলেন, সেদিনই তো স্বামী-স্ত্রীর সেই সমতার বন্ধনটা আপনি ভেঙে দিয়েছিলেন। আপনি আমাকে ফেলে যাননি, আপনি আমাকে নিজের সুবিধার জন্য এই বাড়ির দারোয়ান বানিয়ে রেখে গিয়েছিলেন।”
“আমি তো টাকা পাঠিয়েছি শাহানা! আমি কি দায়িত্ব পালন করিনি?”
“টাকা তো একজন ভাড়াটে ম্যানেজারকেও দেওয়া যায় ইরফান সাহেব। কিন্তু এই এক বছরে আমি যে শ্রম দিয়েছি, যে আত্মসম্মান নিয়ে এই পরিবারকে রক্ষা করেছি—তা কোনো টাকার বিনিময়ে কেনা যায় না। আমি আজ আর কারো আশ্রিত নই। আমি এখন একটি স্কুলের শিক্ষিকা, আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি।”
ইরফানের অহংকারে চরম আঘাত লাগল।
“তার মানে তুমি আমার সাথে যাবে না?”
“না। যাব না।” শাহানার কণ্ঠস্বর ছিল পাথরের মতো অটল, “যে পুরুষ সংকটের দিনে নারীকে একা ফেলে পালিয়ে যায়, আর সুদিনের সময় তাকে নিজের অলংকার বানিয়ে প্রদর্শন করতে চায়—সেই পুরুষের ছায়াতলে যাওয়ার মতো হীনমন্যতা আমার নেই। আমি এই বাড়ির দায় কাঁধে নিয়েছিলাম বাধ্য হয়ে, কিন্তু আজ সেই দায়ই আমাকে আমার মুক্তির সন্ধান দিয়েছে।”
ইরফান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সমস্ত বৈষয়িক সাফল্য, তার জার্মানির ডিগ্রি, তার বিদেশি টাকা—সব যেন এই এক নারীর আত্মমর্যাদার সামনে এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, সে এক সাম্রাজ্য জয় করতে গিয়ে তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সত্যটিকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে।
বাইরে তখন চৈত্রের শেষ বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে।
শাহানা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। পশ্চিমের আকাশে এক টুকরো শুকতারা জ্বলজ্বল করছে। বাতাস বইছে শান্ত, স্নিগ্ধ। শাহানা বুকভরে নিঃশ্বাস নিল। জীবনে কিছু দায় মানুষকে দাস বানায়, আর কিছু দায় মানুষকে তার নিজের শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়। শাহানা আজ সেই মুক্তির আলোয় স্নান করে এক নতুন নারীরূপে পুনর্জন্ম লাভ করেছে।
—{সমাপ্ত}
[বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের চিরাচরিত বাস্তবতায় ‘দায়’ শব্দটির অর্থ বড় অদ্ভুত। এখানে পুরুষের দায় প্রায়শই শেষ হয় কেবল কিছু বৈষয়িক অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে, আর নারীর দায় হয়ে দাঁড়ায় আজীবন নিঃশব্দে আত্মবলিদান দেওয়া। আমি চেষ্টা করেছি নারীর অন্তর্জগতের এই নীরব দাসত্বকে ভেঙে ফেলে তার নিজস্ব ব্যক্তিসত্তাকে প্রতিষ্ঠা করার আপসহীন সংগ্রামকে তুলে ধরতে।
❝দায়❞ গল্পটিতে কোনো কৃত্রিম মেলোড্রামা বা সস্তা রোমান্টিসিজমের স্থান নেই। ইরফান কোনো রক্তপিপাসু খলনায়ক নয়; সে আমাদের সমাজের সেই তথাকথিত আধুনিক ও বাস্তববাদী পুরুষের প্রতিনিধি, যে নিজের স্বার্থের জন্য পরিবার ও ভালোবাসাকে অনায়াসে বন্ধক রাখতে পারে। অন্যদিকে শাহানা সেই চিরায়ত অথচ আধুনিক নারী, যে পরিস্থিতির শিকলে বন্দি না থেকে নিজের আত্মমর্যাদাকেই নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি বানিয়ে তোলে। ত্যাগ কোনো দুর্বলতা নয়; কিন্তু সেই ত্যাগ যখন আত্মোপলব্ধিতে রূপান্তরিত হয়, তখনই একজন নারী নিজের জীবনের প্রকৃত চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। সম্পর্কের আসল ভিত্তি কোনো আইনি অধিকার বা আর্থিক নির্ভরতায় নয়; তা টিকে থাকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর সহমর্মিতার সমান্তরাল অবস্থানে।]