অসমাপ্ত আত্মকথন — রমজান বিন মোজাম্মেল

আমি খুব সাধারণ একটি মানুষ, শহরের আট-দশটা মানুষের মত সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে আমার ঘুম ভাঙেনা। কারণ সবাই যখন ঘুমের দেশে তখন আমি চেয়ার-টেবিলে শব্দের নুড়ি কুড়াই। আমি ফরজ নামাজ আদায় করে ঘুমাতে যাই, তখন অনেকে ইঠে যায়। আমি ভোর দেখাতে দেখা মিলে সেই উঠে যাওয়া অনেকের সাথে। আমার মা বলেন, মানুষ যখন অর্থ উপার্জন করে; তুই তখন ঘুমাস। “তোর জীবনে আর যা থাকুক সেই সবের সবচেয়ে বেশি থাকবে টাকার অভাব “!

মায়ের কথা বিফলে যায় কখনো?

রাজধানীর মত মহানগরীর মানুষ এতটা যান্ত্রিক না হলেও কর্মচঞ্চল। কিন্তু এই শান্ত ভোর দেখার মজাটা কেউ ছাড়ে না বলেই আমার ধারণা। আমিই বা এর ব্যতিক্রম হব কেন? আমি ভোরের শিশিরে আমার মুখ ধুই। হাঁটতে গিয়ে লজ্জাবতী পাতা মাড়িয়ে দেই, আমি রবীন্দ্রনাথের গান প্রাণ ভরে শুনি, জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ি। আমি জাহানারা ইমামকে বলি বাংলার জননী। আমি নজরুলের বিদ্রোহী মনোভাবকে সাধুবাদ জানাই। “আমি অমাবস্যা রাতকে সবচেয়ে ঘৃণা করি কারণ সেদিন আমাদের সকল কালো পাপগুলো নিয়ে সে পাপী হয়ে যায়। আমি রোদে ভিজতে পছন্দ করি। সবসময় মা বাসায় আমাদের পাশাপাশি অনুভব করি।
আমি প্রতি পূর্ণিমায় নিজেকে দেখি কারণ পূর্ণিমা আমার আয়না। আমি গ্রামে গেলে ‘রাজাকার’ আর ‘মুক্তিযোদ্ধা’ খুঁজি, ছোট্ট পুতুলটা পানিভর্তি বালতিতে ফেলে ‘ডুবন্ত মানুষ’ উদ্ধার করা খেলি। দুষ্টু চড়ুইটা আমার শুকোতে দেয়া জামায় ‘ইয়ে’ করে দেয়। আমি কাকের সাথে গল্প করি এবং তাকে জগতের শ্রেষ্ঠ সুন্দর পাখিদের মধ্যে অন্যতম মনে হয়। ‘আমার চোখে স্বপ্ন অনেক। দেশটা সুন্দর হবে, মানুষগুলোর থাকবে সুন্দর মন। আমি সূর্যের চোখে চোখ রেখে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ দেখতে পাই।

কবর দেখলে মনে হয় এমন ঘরে একদিন আমিও থাকব, রাস্তায় বাড়িয়ে দেয়া নির্লজ্জ ভিখারীর হাতে দু’পয়সা দিতে আমি কার্পণ্য করি না। ‘৭১-এর শহীদদের রক্তগুলো কেউ হয়তো কালো কৃষ্ণচূড়ার গাছে ঢেলে দিয়েছিল, তাই হয়তো ফুলগুলো লাল। অন্ধকারের চাদরে সবাই যখন ঢাকা পড়ে-তখন আমার মনে হয় সত্যিই কি আমি মানুষ? তবে আমার মনুষ্যত্ব কই? পশুর আচরণ কেন আমার মধ্যে…। চোদ্দ বছর বয়সী এই আমি, মনে প্রশ্ন জাগে-আসলে আমি কে? একজন সাধারণ মানুষ নাকি; অন্যকিছু, এর চূড়ান্ত উত্তর আজও আমি সমানতালে সন্ধান করছি…।

— রমজান বিন মোজাম্মেল
সম্পাদক / প্রকাশক
পাক্ষিক পুরাতন পাতা

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...