Khandker MAHADI HASAN SUJAN

সময়ের প্রতিশোধ নয়, সমতা
*************************
​এই নশ্বর পৃথিবীর সাধারণ মানুষ প্রায়শই মনে করে, সময় বুঝি মানুষের ওপর কোনো না কোনোভাবে নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নেয়। কিন্তু মহাকালের গভীর দর্শনে সত্য হলো—সময় কখনো কারো ওপর ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ থেকে প্রতিশোধ নেয় না; প্রতিশোধ নেওয়া তো মূলত মানুষের এক অতি সংকীর্ণ ও দুর্বল প্রবৃত্তি। সময়ের কোনো আক্রোশ নেই, কিন্তু সময়ের একটি অত্যন্ত গোপন ও অলঙ্ঘনীয় চিরন্তন নীতি আছে: সে সর্বদা মহাবিশ্বে এবং মানুষের জীবনে এক পরম ‘সমতা’ ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। সময়ের এই সমতা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি কখনো আসে অত্যন্ত ধীর পায়ে—যা মানুষ সহজে টের পায় না, আবার কখনোবা তা ধেয়ে আসে এক আকস্মিক বজ্রপাতের মতো। অবুঝ মানুষ অহংকারবশত ভেবে বসেছিল যে, সে অন্য কারো অধিকার খর্ব করে বা কারো মন ভেঙে নিজে আজীবন অক্ষত ও সুখী থাকবে—কিন্তু সময় সেই অন্যায়ের ও ক্ষতির প্রতিধ্বনি ঠিকই একদিন তার নিজের জীবনে ফেরত পাঠায়। এই অমোঘ নিয়মটি কোনো প্রতিশোধ নয়; এটি হলো প্রকৃতির বুকে ঐশ্বরিক ভারসাম্যের এক মহিমান্বিত পুনরুদ্ধার।
​মানুষ যখন তার যান্ত্রিক জীবনে কোনো পবিত্র সম্পর্কের মধ্যে কিংবা সমাজের বুকে অনাচার, চরম অবহেলা, নিষ্ঠুরতা এবং অন্ধ স্বার্থপরতার বীজ বপন করে, সময় তখন এক নীরব সাক্ষী হয়ে সেই সবকিছুর হিসাব নিজের ডায়েরিতে চুপচাপ জমা রাখে। সে অন্যায়ের সাথে সাথেই কোনো উচ্চবাচ্য করে না বা তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেয় না, কারণ সময়ের মালিকের ধৈর্য অসীম। সময় পরম মমতায় ও সুযোগ দিয়ে অপেক্ষা করে মানুষের ভেতরের শুভ বুদ্ধির উদয়ের দিকে, তার মানসিক পরিবর্তনের দিকে এবং তার অন্তরের গভীর থেকে উঁকি দেওয়া এক বিন্দু খাঁটি অনুতাপ বা তওবার দিকে। কিন্তু যখন মানুষের এই অহংকারী অবাধ্যতা ও অনুশোচনাহীনতা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে, তখন সময় তার সেই অমোঘ সমতার দরজাটি খুলে দেয়—যেখানে মানুষের অতীতে করা প্রতিটি মন্দ আচরণের নিখুঁত প্রতিফলন হুবহু তার নিজের ভাগ্য হয়ে তার সামনে এসে হাজির হয়।
​সময়ের ফিরিয়ে আনা এই সমতা আসলে কোনো ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি হলো মানুষের আত্মার এক গভীর ‘শুদ্ধি-প্রক্রিয়া’। এই স্তরে এসে মানুষ জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি খায় এবং হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারে যে—সে অতীতে অন্যকে যা দিয়েছিল, আজ জীবনের এই কঠিন বাঁকে এসে সে নিজের ঝুলিতে ঠিক তাই ফেরত পেয়েছে। সময়ের এই চাকা যখন ঘোরে, তখন সেই প্রাপ্তিটি মানুষের জন্য যতই কঠোর কিংবা বেদনাদায়ক হোক না কেন, এই আঘাতই মূলত মানুষকে ভেতর থেকে পুরোপুরি বদলে দেয়। তার ভেতরের জমে থাকা সমস্ত অহংকারের দেয়াল চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। সময় তাই মানুষের জীবনে কখনো কোনো শত্রু হয়ে আসে না; সে কেবল জীবনের এক নির্মম ও স্বচ্ছ আয়না আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে—যেখানে মানুষ নিজেরই ফেলে আসা অতীত কর্মের কুৎসিত ছায়াটিকে দেখতে বাধ্য হয়।
​ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যে সমাজে বা রাষ্ট্রে অনাচার, জুলুম এবং অবিচার চরম সীমায় পৌঁছায়, সময় সেখানেও তার অলঙ্ঘনীয় সমতা ফিরিয়ে আনে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাধ্যমে। যে উদ্ধত মনে ক্ষমতার বা রূপের তীব্র অহঙ্কার জমে, সময় সেখানে এক নিমেষেই চরম নম্রতা ও অসহায়ত্বের এক কঠিন পাঠ লিখে দেয়। আবার যে পবিত্র পারিবারিক বা মানবিক বন্ধনে অবহেলা ও অসম্মান ছড়ায়, সময় সেখানে এক নির্মম বিচ্ছেদ বা দূরত্বের দেয়াল তুলে দিয়ে মানুষকে শিখিয়ে যায় সম্পর্কের আসল দায়িত্ব ও মূল্য কতখানি। ইসলামি জীবনদর্শনে একেই বলা হয় ‘মাকরে ইলাহী’ বা স্রষ্টার সুনিপণ ও অদৃশ্য কৌশল, যা জালিমের জুলুমকে রুখে দিয়ে মজলুমের অশ্রুর নিখুঁত হিসাব চুকিয়ে দেয়।
​অতএব, মহাকালের এই সময়ের সামনে আমাদের কোনো অন্ধ ভয় বা আতঙ্ক নিয়ে নয়, বরং এক গভীর আধ্যাত্মিক বোঝাপড়া ও আত্মসমীক্ষা নিয়ে দাঁড়ানো উচিত। আমাদের বোঝা দরকার যে, সময় তার নিজের নিয়মে কখনো বদলায় না, সে তার আপন গতিতেই বয়ে চলে—আমরাই আসলে সময়ের এই অমোঘ ও পবিত্র নিয়মের অধীনে প্রতিনিয়ত বদলে যাই, ক্ষয়ে যাই কিংবা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এক নতুন আলোকিত মানুষে পরিণত হই। যে মানুষ সময়ের এই সমতার বিচারকে মাথায় রেখে নিজের প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলে, সে কখনো অন্যের ক্ষতি করতে পারে না; কারণ সে খুব ভালো করেই জানে—আজ সে বাতাসে যা ছুড়ে দিচ্ছে, মহাকালের চক্কর কেটে তা একদিন তার নিজের বুকেই ফিরে আসবে।

10 Comments
  • র
    রমজান বিন মোজাম্মেল

    হক কথা

    Reply · 2 months ago
  • R
    Rabi

    Nice

    Reply · 2 months ago
  • A
    Author / Writer

    ডিজিটাল এই যুগে যখন মন সবসময় বিক্ষিপ্ত থাকে, তখন এই ধরনের গভীর লেখা আমাদের ফোকাস ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

    Reply · 2 months ago
  • P
    Pradipta Sarkar

    পড়লাম । ভালো লাগলো ।

    Reply · 2 months ago
  • R
    Rupam Saha

    ভালো ।

    Reply · 2 months ago
  • R
    Rishi Sarkar

    নিজের সাথে নিজের লুকোচুরি খেলা বন্ধ করে সত্যিটাকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর এক অনন্য সাহস জোগায় এই লেখাটি।

    Reply · 2 months ago
  • D
    Debajyoti Biswas

    এই কন্টেন্টটি পড়ার পর জীবনকে নতুনভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। এটি কেবল একটি লেখা নয়, বরং মানুষের ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করার এক জাদুকরী চাবিকাঠি।

    Reply · 2 months ago
    • Anonymous

      ধন্যবাদ আপনাকে। লেখাটির মূল ভাব বুঝে মন্তব্য করার জন্য আপনাকে শ্রদ্ধা….

      Reply · 2 months ago
  • A
    Anil Das, Kolkata.

    ”আঘাতই মূলত মানুষকে ভেতর থেকে পুরোপুরি বদলে দেয়। ” এই বাক্যটি মনে রাখার মতো ।

    Reply · 2 months ago
  • ট
    টি. রায় ।

    খুব ভালো লাগলো স্যার ।

    Reply · 2 months ago

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...