Manab Mondal

প্রখ্যাত অঙ্কো সার্জন ডাক্তার রঞ্জন মুখার্জি এই মুহূর্তে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছেন। ওনার হাতে পুষ্পস্তবক তুলে দিচ্ছে আমাদের সহকর্মী নীলাঞ্জনা রায় চৌধুরী,

মাইকে নিজের নামের অ্যানাউন্সমেন্ট শুনে নীলাঞ্জনা চমকে উঠলো। এরকম কিছু যে হতে পারে ও জানতোই না! ও অবাক হয়ে বললো,

আমি! আমার নাম কে দিলো! প্লিজ! আমি স্টেজে উঠবো না।

সোমাদি হসে বলল কেনো? রঞ্জন মুখার্জি কি বাঘ না ভাল্লুক? তোকে খেয়ে ফেলবে নাকি?
রঞ্জন মুখার্জি যতোটা বিখ্যাত, ততোটা কুখ্যাত ওর চরিত্রে জন্য।

সুমন্ত কি একটা টিপ্পনী কাটলো। ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট রমেশ দা বললেন, ভালো সিনসিয়ার কর্মী হিসেবেই তো তোমার নাম দেওয়া হয়েছে। যেতে কিসের অসুবিধা তোমার? নাম অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে। এখন অন্য কাউকে কি করে আর দেওয়া সম্ভব?

নীলাঞ্জনা বাধ্য হয়েই পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে স্টেজের সিঁড়ির সামনে দাঁড়ালো। অডিটোরিয়ামের বিরাট বড় স্টেজের দুটো দিক। দু দিক দিয়েই ওপরে ওঠার সিঁড়ি আছে। নীলাঞ্জনা এ পাশের সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে দেখলো রঞ্জন ততক্ষণে উল্টো দিকের সিঁড়ি দিয়ে স্টেজের দিকে উঠে যাচ্ছে।

নীলাঞ্জনা একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলো। লম্বা, শ্যামলা চেহারার নিখুঁত শেপে কাটা হালকা দাড়ি আর চশমার আবরনে ঢাকা ঝকঝকে বুদ্ধিদীপ্ত চোখের এই তরুণের সঙ্গে পুরোনো রঞ্জন মিল বলতে ওই ঝকঝকে চোখ দুটোই। হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গিমা অবশ্য ঠিক সেই আগের মতনই! সেই একই রকম দৃঢ়চেতা ভাব! প্রতি পদক্ষেপে আমিই সেরা বলে বুঝিয়ে দেওয়া। প্রতি বছর যে দৃশ্য দেখতে অভ্যস্ত ছিলো ওদের ছোটো বেলার স্কুল ।
এই কারণ ওকে জ্বালাতে ও অভির সাথে প্রেম করতে নিলো। কিন্তু প্রেমের নামে একটা শারীরিক সম্পর্ক জড়িয়ে যাচ্ছিলো। ভাগিস শিক্ষক হিসেবে মানব ওর জীবন এলো নয়তো জীবনটা হয়তো বয়ে যেতো অন্য খাতে।

রিমি বললো কি রে! দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? উনি তো স্টেজে উঠে পড়েছেন!

পেছন থেকে আসা ছোট্ট খোঁচা খেয়ে সম্বিৎ ফিরল। বুকের গভীর থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাস চেপে নিয়ে, নিজের বুকের মধ্যের ঝড়কে জোর করে শান্ত করতে করতে সিঁড়ির ধাপে পা রাখলো নীলাঞ্জনা। মাথা নিচু রেখেই ধাপগুলো পেরিয়ে এসে স্টেজে দাঁড়ালো ও। পাশেই দাঁড়ানো কেউ ওর হাতে ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিলো। স্টেজের ওপরে কারা কারা বসে আছে নীলাঞ্জনা যেনো বুঝতেও পারছে না। চোখের সামনেটা ঝাপসা লাগছে। বুকের ভেতরটা যেনো কেউ খামচে ধরেছে বলে মনে হচ্ছে। দমবন্ধ হয়ে আসছে। নীলাঞ্জনা কোনো দিকে না তাকিয়ে রঞ্জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মাথা নিচু রেখেই ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিলো।

থ্যাংক ইউ!

ভরাট গলায় ছোট্ট দুটো শব্দ ভেসে এলো। নীলাঞ্জনা মুখ তুলে তাকালো না। ধন্যবাদের উত্তরে কি কিছু বলা উচিত ওর! কিন্তু কি বলবে ও! রঞ্জনকে বলার মতন কোনো কথা তো ওর নেই। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে দ্রুত পায়ে স্টেজ ছেড়ে নেমে এলো নীলাঞ্জনা।

কোথায় যাচ্ছিস? প্রোগ্রাম তো সবে শুরু হলো!

পেছন থেকে ধেয়ে আসা প্রশ্নটা শুনেও নীলাঞ্জনা ফিরে তাকালো না। এই মুহুর্তেই ওকে এখান থেকে চলে যেতে হবে।নীলাঞ্জনার বুকের ভেতরটা কাঁপছে। হাতের আঙুলের ডগা গুলো ঠান্ডা। সোমা দি বলল
এই সুযোগটা মিস করিস না। উনি এখন তোর ওপর দুর্বল।সুমন্ত ওর যেনো চোখে গিলে খাচ্ছে। ওদের ব্রেকআপ হয়েছে দুই তিন সপ্তাহ হলো। কারণ তুচ্ছ হলে ওর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ফাঁকা ফ্লাট ওকে ধর্ষণ করা চেষ্টা করছিল সুমন্ত। ও সেটা করতে দেয় নি। সুমন্ত মাথা গরম করা ছেলে ওর যুক্তি ওরা তো বিয়ে করবেই , তাই নীলাঞ্জনার উচিত ওর শারীরিক চাহিদা মেটানোর। আর নীলাঞ্জনা ধোঁয়া তুলসী পাতা নয় , মানবের সাথে ডিভোর্সের পর প্রদীপ সাথে লিভ টুগেদারে থেকেছে, ওর এক্স প্রেমিক দেবপ্রিয়দের সাথে দিঘা পুরী পুরুলিয়া ঘুরতে গেছে। হুঁ নীলাঞ্জনা হয়তো ভালো জীবন পাবার লোভে অনেক ছেলের সাথে সম্পর্ক এসেছে। কিন্তু এখন সে ক্লান্ত একটা স্থায়ী সম্পর্ক চায়।
সোমা দি বললো ” বোকামি করছিস কেন রঞ্জন তো বললো ওর গাড়ি করে বাড়ি যেতে, ওতো সবার সামনেই বললো ছোট বেলা থেকেই তোরা পাশাপাশি পাড়ায় থাকিস। তবু কেন তুই এমন করছিস। এটা তোর কাছে বড়ো সুযোগ।”

নীলাঞ্জনা চুপ করে ছিলো। এই কথার উত্তরে ঠিক কি বলবে ও! বারো বছর পরে আজ মুখোমুখি রঞ্জন মুখার্জির হলো। ওর বৌ ভাতে দেখা হয়েছিল ওদের সাথে শেষ। ও কলকাতা একটা মেডিক্যাল কলেজ সুযোগ পেয়েছিলো। কিন্তু সেই সুযোগ ছেড়ে দিয়ে ও অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেলো ডাক্তারি পড়তে। মানবের লেখা গান গাইতো ও তাই মানবের সাথে ওর রোজ কথা হতো , সে সময় ও এমন ভাব দেখাতো। নীলাঞ্জনাকে ও চেনেই না।

হলেও ও যে রঞ্জন মুখার্জির সব খবর রাখে আজ নীলাঞ্জনা সেটা কি ও বলতে পারবে কাউকে! কারণ মানব ছেড়ে এসে ও বুঝতে পেরেছে , এই দুনিয়ায় একটা মেয়ের শরীরটাকে সবাই ছুঁতে চায়, প্রদীপ ওকে বলেছিলো “মানব তোমাকে পড়াশোনা শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করেছে বলে ওর ব্যবসা বাণিজ্য শেষ হয়ে যাওয়ার শেষ হবার পরেও ওর সাথে সম্পর্ক রাখাটা বোকামি। তুমি কর্মক্ষেত্রে অনেক উন্নতি করবে তারপর নাহায় ওর জীবন ফিরে এসে আবার ওর সব কিছু সামলে নেবেন। এখন ও ডুবছে ও তোমাকে নিয়ে ডুববে।”
নীলাঞ্জনা সেই দিন প্রদীপের কথা বিশ্বাস করে চোখ রঙীন স্বপ্নের কাপড় বেঁধে জীবনে যেন কানামাছি খেলায় নেমেছিল। কর্পোরেট ওয়াল্ড ময়দানে কানামাছি খেলায় মাতলো ও। যাকে পাবি তাকে ছোঁ, যে পাবি সে ছোঁ। কিন্তু রঞ্জন সেই বৃষ্টি ভেজা চিলেকোঠার ঘরে সবকিছু করা সুযোগ পেয়েও কিছু করনি।

অথচ সবাই বলে রঞ্জন নাকি এখন চরিত্র হীন। কিন্তু নীলাঞ্জনা মানতে পারে না সে কথা। টিভির পর্দায় যে নিয়মিত ওকে দেখা যায় এখন রঞ্জনকে। খুব সেলেব্রিটি ও। তবুও নীলাঞ্জনার বিশ্বাস ওর থেকে বেশি আর কে জানে না ওকে। যতটুকু সময় টিভির পর্দায় থাকে রঞ্জন ও ততক্ষন একবারের জন্যেও তো টিভি থেকে চোখ সরায় না! তবুও আজ ওর সাথে বাড়িতে যেতে ভয় করছে ও।

সোমা দি বললো তুই ওর সাথে যাবি ।নীলাঞ্জনা না বলতে পারলো না। কিছু বলা সম্ভব নয়। কথাগুলো শোনার মতন অবস্থায় নেই ও। একটু আগের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ও রঞ্জন এর মুখের দিকে একবারও তাকায় নি। কিন্তু রঞ্জন! ও কি তাকিয়েছিল ওর দিকে! চিনতে পেরেছিলো নীলাঞ্জনাকে! নাকি পারে নি! পারলে কি ওরকম নির্লিপ্ত গলায় কথা বলতে পারতো ও! থ্যাংক ইউ বলার সময় তো ওর গলা একটুও কাঁপেনি!
অথচ কিছুক্ষণ পরেই সবার থেকে ওর পরিচয় পেয়ে বলে উঠলো ” ও তাই জন্য আপনাকে চেনা চেনা লাগছে , তা আমার বাড়ির সামনে আপনার বাড়ি , অনুষ্ঠান শেষে তাহলে একসাথে ফিরবো।

প্রায় মিনিট চল্লিশ বক্তব্য রাখলেন ডাক্তার রঞ্জন মুখার্জি। প্রবল করতালির আওয়াজে বাস্তবে ফিরে নীলাঞ্জনা বুঝলো ওর বক্তব্য শেষ হয়েছে।
অডিটোরিয়ামের সামনে এই মুহূর্তে বেশ ভিড়। ডাক্তার মুখার্জি হল ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আরো কয়েকজন ডাক্তার আছেন।
সবাইকে এড়িয়ে সবাইকে অবাক করে রঞ্জন নীলাঞ্জনা কে বলেন শুনলে পুরোটা? কেমন লাগলো বলো?

যদিও ও কিছুই শোনে নি তাও নীলাঞ্জনা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো।” খুব সুন্দর হয়েছে স্যার। আপনার বক্তব্য শুনতে সব সময়ই ভালো লাগে।”
রঞ্জন বললো ” চল তাহলে বাড়িতে যাওয়া যাকে ।”
রঞ্জন বাড়ির সামনে এসে বললো। ” বাড়িতে আসবে না। আমি আমার এক দাদা ছাড়া কেউ থাকে না। তুমি আসতে পারো একটু আড্ডা মারে যাও দা ভালো লেখেন, রান্না করেন। তোমার প্রিয় ব্রাউনি কেক বানিয়েছে দাদা খেয়ে যাও একটু।”
নীলাঞ্জনা খুব খুশি হলো। ” তুমি এখনো মনে রেখেছো। আমার ফেবারিট কেক ব্রাউনি।”
রঞ্জন বললো ” না আমি না দাদা মনে রেখেছেন।”
দরজা খুলে মানব বললো ” হাপি বার্থ ডে নীলাঞ্জনা”

নীলাঞ্জনার গলা ভরাট হয়ে গেলো , কোন কিছুতেই কোন আওয়াজটা যেন বের হলো না ।নীলাঞ্জনাকে কয়েক মুহূর্তের জন্যে অবশ করে দিলো খুব চেনা গলাটা…

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...