Md. Maher Tajwar Hamim

শিরোনাম: চার সত্যের সামনে মানুষের সব অহংকার ম্লান

মোঃ মাহের তাজওয়ার হামীম
প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক

মসজিদে ইমামতি শুরু করেছি বেশি দিন হয়নি। নতুন জায়গায় এসে পরিচয় হলো এক অসহায় কাকুর সঙ্গে। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষটি প্রতিদিন কাজের খোঁজে বের হন। শুনেছি, বয়স তাঁর অনেক; কিন্তু তাঁর পরিশ্রম দেখে তা বোঝার উপায় নেই।

খাওয়ার সময় হলে তিনি প্রায়ই আমার সঙ্গে বসেন। একা খেতে আমার ভালো লাগে না—পাশে কেউ না থাকলে খাবার যেন মুখে রোচে না। একদিন আমরা দুজন খেতে বসে গল্প করছিলাম। কথার ফাঁকে কাকু বললেন, “মানুষ পৃথিবীর অনেক কিছু আয়ত্ত করতে পারে, কিন্তু চারটি বিষয় কখনোই পুরোপুরি নিজের হাতে নিতে পারে না।”

কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কী সেই চারটি বিষয়, কাকু?”

তিনি একটু ইতস্তত করে বললেন, “স্যার, আমি তো অল্পশিক্ষিত মানুষ—যা বুঝি, তাই বলি। কিছু মনে করবেন না। মানুষের মৃত্যু, তার নির্ধারিত আয়ু, রিজিক আর সম্পদ—এসবের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে নয়। আল্লাহ না চাইলে মানুষ এগুলো নিজের ইচ্ছেমতো করতে পারে না।”

কথাগুলো শুনে আমি মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেলাম। অক্ষরজ্ঞান কম হলেও কাকুর উপলব্ধিতে ছিল জীবনের গভীর সত্য। অথচ আমরা অনেক সময় এমনভাবে চলি, যেন সবকিছুই আমাদের মুঠোয়। সামান্য সাফল্য, জ্ঞান বা সম্পদের গর্বে ভুলে যাই—আমরা কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি, আর একদিন কোথায় ফিরে যাব।

মানুষ চেষ্টা করে, পরিশ্রম করে, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করে—এগুলো জীবনেরই অংশ। কিন্তু সব চেষ্টার ফল আমাদের ইচ্ছেমতো হয় না। আগামীকাল কী ঘটবে, এমনকি কিছুক্ষণ পর কী হবে—তা-ও আমরা নিশ্চিত করে জানি না। মৃত্যুকে ঠেকাতে পারি না, আয়ু নিজের ইচ্ছায় বাড়াতে পারি না, আর রিজিকের প্রতিটি দরজা নিজের শক্তিতে খুলতে পারি না। তাহলে এত অহংকার কিসের?

মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সম্মানিত; কিন্তু সেই সম্মানের অর্থ অন্যকে তুচ্ছ করা নয়। বরং নিজের সীমা বোঝা, কৃতজ্ঞ থাকা এবং মানুষের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ করাই প্রকৃত মর্যাদা। শক্তি, সম্পদ কিংবা পদ—কোনোটিই মানুষকে সবকিছুর মালিক বানায় না। অহংকারের অধিকার একমাত্র আল্লাহর; মানুষের জন্য শোভন হলো বিনয়।

সেদিনের পর কাকুর কথাগুলো আমার মনে গেঁথে আছে। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন—কাউকে তার পোশাক, আর্থিক অবস্থা কিংবা শিক্ষার পরিমাণ দেখে বিচার করা ঠিক নয়। যাঁকে আমরা দুর্বল বা অজ্ঞ ভাবি, তাঁর কাছ থেকেও এমন শিক্ষা পেতে পারি, যা বহু বই পড়েও কখনো উপলব্ধি হয় না।

হে বন্ধু, নিজের সাফল্যে গর্বে অন্ধ হয়ো না। চেষ্টা করো, পরিশ্রম করো, স্বপ্ন দেখো—কিন্তু ভুলে যেয়ো না, সবকিছুর চূড়ান্ত মালিক তুমি নও। মানুষের অহংকার যত বড়ই হোক, মৃত্যু, আয়ু, রিজিক আর সম্পদের সত্যের সামনে তা একদিন ম্লান হয়ে যায়।

0 Comments

Md. Maher Tajwar Hamim

শিরোনাম: স্ক্রলে স্ক্রলে হারিয়ে যাচ্ছি: ডিজিটাল সংযোগে কেন বাড়ছে একাকিত্ব?

মোঃ মাহের তাজওয়ার হামীম
প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক

হাতে স্মার্টফোন, পর্দায় অসংখ্য বার্তা, আর অনলাইনে পরিচিত মানুষের ভিড়—তবু ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেই কেন মনে হয়, আমরা ভীষণ একা? প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু তার নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহারের ভিড়ে বাস্তব সম্পর্ক, নিজের সঙ্গে সংযোগ এবং জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলো কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে?

বর্তমান সময়ের বড় একটি অংশ কেটে যায় ডিজিটাল জগতে—স্মার্টফোনের পর্দায়, একের পর এক স্ক্রলে। সকালে ঘুম ভাঙা থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত ফোনটি যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী। কোনো খবর জানতে, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে, পড়াশোনা বা কাজ করতে—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইন্টারনেটের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যে কখনো কখনো আমরা ভুলে যাই জীবনের অর্থ কী, আত্মীয়তার সম্পর্কের মূল্য কতটা, কিংবা কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কেন জরুরি।

অনেকের মনে হয়, হাতে একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যেন সব আছে। বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা না দিলেও, মাঠে খেলতে না গেলেও, কিংবা পরিবারের সঙ্গে মন খুলে কথা না বললেও তারা একাকিত্ব টের পায় না। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কারও কারও মনে হয়—পৃথিবীতে তার চেয়ে একা আর কেউ নেই। এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবায়: ডিজিটাল সংযোগ কি সত্যিই একাকিত্ব কমায়, নাকি কখনো তা আড়াল করে আরও বাড়িয়ে তোলে?

ইন্টারনেট নিঃসন্দেহে মানুষের জন্য অসংখ্য সুযোগ তৈরি করেছে। কোনো বিষয় জানতে চাইলে অল্প সময়েই তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। দূরে থাকা স্বজনের সঙ্গে কথা বলা, পড়াশোনা, কাজ, সংবাদ ও বিনোদন—সবই এখন হাতের মুঠোয়। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে, সময় বাঁচাতে এবং নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।

কিন্তু একই প্রযুক্তির অসচেতন ব্যবহার সময়, মনোযোগ ও সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে। একের পর এক ভিডিও দেখা বা উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রল করতে করতে কখন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না। কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ব্যবহার ঘুম, পড়াশোনা, কাজ কিংবা পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়ে ব্যাঘাত ঘটায়। অনলাইনের ব্যস্ততা বাড়লেও সামনাসামনি কথোপকথন কমে যেতে পারে—আর তখন সম্পর্কের গভীরতা ক্ষীণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটকে আগুনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আগুন দিয়ে আমরা খাবার রান্না করি, শীতের সময় তাপ পাই; কিন্তু অসতর্কভাবে ব্যবহার করলে সেই আগুনই ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিতে পারে। প্রযুক্তিও তেমন। সচেতনভাবে ব্যবহার করলে তা জ্ঞান ও উন্নতির সহায়ক; আর নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই প্রশ্নটি শুধু—ইন্টারনেট ভালো না খারাপ—এতটুকু নয়। বরং প্রশ্ন হলো: আমরা কী উদ্দেশ্যে, কতটা সময় এবং কতটা দায়িত্ব নিয়ে এটি ব্যবহার করছি?

বিশেষ করে তরুণদের জন্য এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় অনলাইনে থাকা কারও কারও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ পিছিয়ে দিতে পারে, কিংবা ক্ষতিকর ও অনুপযুক্ত বিষয়বস্তুর কাছে নিয়ে যেতে পারে। তবে ইন্টারনেটকে সম্পূর্ণ বর্জন করাই একমাত্র সমাধান নয়। শিক্ষা, যোগাযোগ ও কাজের ক্ষেত্রে এর প্রয়োজন রয়েছে। দরকার সচেতন ব্যবহার—সময়ের সীমা ঠিক করা, উপকারী বিষয় বেছে নেওয়া, নিজের অনলাইন অভ্যাসের প্রতি খেয়াল রাখা এবং বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও সম্পর্ককে সমান গুরুত্ব দেওয়া।

একটু ভেবে দেখা যাক—ইন্টারনেট না থাকলে আমাদের দৈনন্দিন জীবন কেমন হতো? আবার ইন্টারনেট থাকা সত্ত্বেও আমরা কি পরিবার, বন্ধু ও সমাজের মানুষের সঙ্গে যথেষ্ট সময় কাটাচ্ছি? একসঙ্গে বসেও যদি প্রত্যেকে নিজের ফোনের পর্দায় ব্যস্ত থাকে, তবে সেই সান্নিধ্য কি সত্যিকারের সান্নিধ্য? অনলাইনে অনেক মানুষের সঙ্গে যুক্ত থেকেও যদি মনের কথা বলার মতো কাউকে না পাই, তবে সেই সংযোগ কতটা গভীর?

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে দ্রুত ও সুবিধাজনক করেছে। কিন্তু এই সুবিধার বিনিময়ে যদি আমরা সম্পর্ক, মনোযোগ কিংবা আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলি, তবে সেই অগ্রগতির অর্থ কী? প্রযুক্তি যেন আমাদের কাজে লাগে—আমরা যেন প্রযুক্তির অভ্যাসের কাছে অসহায় হয়ে না পড়ি। ফোনের পর্দার বাইরেও যে বাস্তব পৃথিবী আছে, সেখানে অপেক্ষা করে প্রিয়জনের কথা, বন্ধুর হাসি, বিকেলের মাঠ, পরিবারের সঙ্গে এক কাপ চা—এসবও জীবনের মূল্যবান অংশ।

অতএব, প্রিয় বন্ধু, নিজেকে একবার প্রশ্ন করো: তোমার স্মার্টফোন কি তোমার জীবনকে সমৃদ্ধ করছে, নাকি তোমার সময় ও মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে? তুমি অনলাইনে কী দেখছ, কী শিখছ, কতটা সময় দিচ্ছ—এসবের প্রভাব তোমার ভবিষ্যতের ওপর কীভাবে পড়ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে নিজের জন্য সচেতন সিদ্ধান্ত নাও।

ডিজিটাল জগতে যুক্ত থাকো, কিন্তু বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করো জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও কল্যাণের কাজে। পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে কথা বলো, সম্পর্কের যত্ন নাও, নিজের মনকেও সময় দাও। কারণ সত্যিকারের সংযোগ শুধু পর্দায় নয়—তা গড়ে ওঠে মনোযোগ, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে।

0 Comments

Md. Maher Tajwar Hamim

শিরোনাম: মানবতা: আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেদের একবার দেখো
উপশিরোনাম: সমাজ, ধর্ম ও নৈতিকতার আলোকে আত্মসমালোচনা

মোঃ মাহের তাজওয়ার হামীম
প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক

আজকের পৃথিবীতে মানবতা যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। কোথাও তা অসহায় মানুষের হাহাকার, কোথাও একমুঠো খাবারের আকুতি, আবার কোথাও নিপীড়িত মানুষের চোখের জল হয়ে প্রকাশ পায়। অথচ আমরা কি কখনো ভেবে দেখি—মানুষ হিসেবে আমাদের প্রকৃত পরিচয় কী? আমরা কি শুধু অর্থ উপার্জন, বিলাসিতা আর নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই পৃথিবীতে এসেছি, নাকি জীবনের আরও গভীর কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে?

আমরা অনেক কিছু জানি, কিন্তু নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়াতে যেন দ্বিধা বোধ করি। কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়, কীভাবে জীবনকে আরামদায়ক করে তুলতে হয়—তা শিখি; কিন্তু কীভাবে একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে হয়, সে শিক্ষা কি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করি?

কেন মানুষ কখনো প্রকাশ্যে, কখনো আড়ালে অন্যকে লাঞ্ছিত করে? কেন দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চলে? কেন কারও অসহায়ত্ব কখনো উপহাসের বিষয় হয়ে ওঠে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই নিজেদের দিকে তাকাতে হবে।

সমাজে কখনো কখনো অশোভন আচরণকে আধুনিকতা, দায়িত্বহীনতাকে স্বাধীনতা কিংবা অন্যায়কে কৌশল বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এগুলো কি সত্যিই আধুনিকতার পরিচয়? বিবেককে বিসর্জন দিলে কি মানুষ আধুনিক হয়? নাকি আধুনিকতার প্রকৃত পরিচয়—জ্ঞান, শালীনতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার সমন্বয়?

ভালোবাসার নামেও কখনো প্রতারণা ও অসম্মানজনক আচরণের ঘটনা ঘটে। রাজনীতিতে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও শোষণের অভিযোগ ওঠে। মাদক ও জুয়ার মতো ক্ষতিকর অভ্যাসও তরুণদের একটি অংশকে বিপথে ঠেলে দিতে পারে। তাই আমাদের ভাবতে হবে—তরুণদের চিন্তা কোন পথে এগোচ্ছে, তাদের আদর্শ কারা, আর তারা কাদের অনুসরণ করছে?

যখন তরুণেরা জ্ঞান, পরিশ্রম ও সৎ কাজের চেয়ে বাহ্যিক চাকচিক্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে, তখন সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ থাকে। তরুণেরাই একটি জাতির আগামী দিনের চালিকাশক্তি। তাদের চিন্তা, চরিত্র ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তার প্রতিফলন পুরো সমাজেই দেখা দিতে পারে।

ধর্ম নিয়েও আমাদের আত্মসমালোচনা করা দরকার। কেউ ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন; আবার কেউ ধর্মের নাম ব্যবহার করেও এমন আচরণ করেন, যার সঙ্গে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা ও মানবিকতার মিল নেই। তাই প্রশ্ন হলো—ধর্মের শিক্ষা কি আমাদের জীবনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? আমরা কি কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা শুধু মুখে ধারণ করি, নাকি আচরণেও তার প্রকাশ ঘটাই?

আমরা কুরআনের আয়াত, হাদিসের বাণী ও ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে জানি। কিন্তু সেই জ্ঞান কি আমাদের মধ্যে দয়া, ন্যায়বিচার ও দায়িত্ববোধ জাগাতে পেরেছে? আমরা কি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই? নিজের রাগ, অহংকার, হিংসা ও স্বার্থপরতা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখি?

জ্ঞান তখনই মানুষের প্রকৃত সম্পদ হয়ে ওঠে, যখন তা তার চরিত্র ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এ আত্মসমালোচনা শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়; আলেম, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের নেতৃত্বে থাকা প্রত্যেকের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।

আলিয়া ও কওমি—উভয় ধারার মাদ্রাসাশিক্ষা নিয়েও গঠনমূলক আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। কুরআন, তাফসির, হাদিস ও ফিকহের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সেই জ্ঞান অনুধাবন করা, জীবনে প্রয়োগ করা এবং মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, সনদ অর্জন কিংবা নির্দিষ্ট পেশায় প্রবেশের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তবে তার বৃহত্তর উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যেতে পারে। একজন আলেমের পরিচয় শুধু বক্তব্যে নয়; তাঁর জ্ঞান, আমল, বিনয়, সততা ও মানুষের সঙ্গে আচরণেও প্রকাশিত হওয়া উচিত। মঞ্চে বলা কথার প্রতিফলন বক্তার নিজের জীবনে থাকলে সেই কথার গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে।

তবে সব আলেম বা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এক কাতারে দাঁড় করানো ন্যায়সংগত নয়। যেখানে জ্ঞানের অপব্যবহার, স্বার্থপরতা, দুর্নীতি বা দায়িত্বহীনতা দেখা যায়, সেখানে ন্যায়সংগত ও গঠনমূলক সংশোধনের দাবি তোলা উচিত।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এক দল ক্ষমতায় আসে, আরেক দল ক্ষমতার বাইরে যায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত পরিবর্তন সব সময় আসে না। রাজনীতিকে যখন জনসেবার বদলে ক্ষমতা অর্জন বা ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের উপায় হিসেবে দেখা হয়, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করার সময় আমরা কি তাঁদের যোগ্যতা, সততা, অতীত কর্মকাণ্ড ও নৈতিক অবস্থান বিবেচনা করি? নাকি কখনো আবেগ, প্রচারণা, দলীয় পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত লাভের আশায় সিদ্ধান্ত নিই?

রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন মানুষের প্রয়োজন, যাঁদের মধ্যে জ্ঞান, সততা, দক্ষতা, ন্যায়বোধ ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতা রয়েছে। পদ বা ক্ষমতা কাউকে আপনাআপনি যোগ্য করে তোলে না; বরং মানুষের যোগ্যতা ও কর্মই তাকে সেই দায়িত্বের উপযুক্ত করে।

পশ্চিমা বিশ্বের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের অনেক ক্ষেত্র থেকেই আমাদের শেখার আছে। তবে শেখা আর অন্ধ অনুকরণ এক বিষয় নয়। অন্যের ভালো অর্জন থেকে শিক্ষা নেওয়া দোষের নয়; জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগোতে পৃথিবীর নানা জাতির অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দরকার। একই সঙ্গে শেখার নামে নিজের বিবেক, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়া থেকেও সতর্ক থাকতে হবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর হওয়া এবং নৈতিকভাবে উন্নত হওয়া—দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। আমরা আধুনিক হতে চাই, জ্ঞানী হতে চাই, উন্নত রাষ্ট্র গড়তে চাই। সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে মানবতা, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাকে রাখতে হবে।

ইসলাম শুধু ইবাদতের নিয়ম শেখায় না; মানুষের অধিকার রক্ষা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব পালন, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নিজের চরিত্র সংশোধনের শিক্ষাও দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন দয়া, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়বিচার ও উত্তম আচরণের এক অনন্য আদর্শ তুলে ধরে। অথচ কখনো কখনো আমরা ধর্মের বাহ্যিক পরিচয় নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত শিক্ষা নিজের জীবনে ধারণ করতে ভুলে যাই।

মানবতার ক্ষেত্রেও আমরা অনেক সময় তার মূল্য বুঝতে দেরি করি। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সহমর্মিতা হারিয়ে গেলে শুধু বক্তৃতা দিয়ে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবু এখনো সময় আছে। আমরা চাইলে নিজেদের পরিবর্তন করতে পারি। সমাজ পরিবর্তনের জন্য শুধু অন্যের সমালোচনা যথেষ্ট নয়; পরিবর্তনের সূচনা হওয়া দরকার নিজের ভেতর থেকে।

তুমি যদি একজন মানুষকে সাহায্য করতে পারো, একজন অসহায় মানুষের চোখের জল মুছতে পারো, নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারো কিংবা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা থেকে বিরত থাকতে পারো—তাহলেই মানবতার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

অতএব, প্রিয় বন্ধু, অন্যের ভুল খোঁজার আগে একবার নিজের দিকে তাকাও। নিজেকে জানতে শেখো, বিবেককে জাগ্রত করো, নিজের রবকে চিনতে শেখো এবং তাঁর রাসুলের আদর্শকে জীবনে ধারণ করো।

মনে রেখো, মানবতা কোনো স্লোগানের নাম নয়; এটি মানুষের প্রতিদিনের আচরণে প্রকাশিত একটি গুণ। ধর্মের শিক্ষা শুধু কথায় নয়, জীবনের কাজেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।

আমাদের সমাজ আমাদেরই তৈরি। তাই সমাজকে বদলাতে হলে প্রথমে নিজেদের বদলাতে হবে। পৃথিবীকে আলোকিত করতে হলে আগে নিজের হৃদয়ে একমুঠো আলো জ্বালাতে হয়।

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...