শিরোনাম: মানবতা: আয়নায় দাঁড়িয়ে নিজেদের একবার দেখো
উপশিরোনাম: সমাজ, ধর্ম ও নৈতিকতার আলোকে আত্মসমালোচনা
মোঃ মাহের তাজওয়ার হামীম
প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক
আজকের পৃথিবীতে মানবতা যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। কোথাও তা অসহায় মানুষের হাহাকার, কোথাও একমুঠো খাবারের আকুতি, আবার কোথাও নিপীড়িত মানুষের চোখের জল হয়ে প্রকাশ পায়। অথচ আমরা কি কখনো ভেবে দেখি—মানুষ হিসেবে আমাদের প্রকৃত পরিচয় কী? আমরা কি শুধু অর্থ উপার্জন, বিলাসিতা আর নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই পৃথিবীতে এসেছি, নাকি জীবনের আরও গভীর কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে?
আমরা অনেক কিছু জানি, কিন্তু নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়াতে যেন দ্বিধা বোধ করি। কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়, কীভাবে জীবনকে আরামদায়ক করে তুলতে হয়—তা শিখি; কিন্তু কীভাবে একজন প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে হয়, সে শিক্ষা কি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করি?
কেন মানুষ কখনো প্রকাশ্যে, কখনো আড়ালে অন্যকে লাঞ্ছিত করে? কেন দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার চলে? কেন কারও অসহায়ত্ব কখনো উপহাসের বিষয় হয়ে ওঠে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই নিজেদের দিকে তাকাতে হবে।
সমাজে কখনো কখনো অশোভন আচরণকে আধুনিকতা, দায়িত্বহীনতাকে স্বাধীনতা কিংবা অন্যায়কে কৌশল বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এগুলো কি সত্যিই আধুনিকতার পরিচয়? বিবেককে বিসর্জন দিলে কি মানুষ আধুনিক হয়? নাকি আধুনিকতার প্রকৃত পরিচয়—জ্ঞান, শালীনতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার সমন্বয়?
ভালোবাসার নামেও কখনো প্রতারণা ও অসম্মানজনক আচরণের ঘটনা ঘটে। রাজনীতিতে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও শোষণের অভিযোগ ওঠে। মাদক ও জুয়ার মতো ক্ষতিকর অভ্যাসও তরুণদের একটি অংশকে বিপথে ঠেলে দিতে পারে। তাই আমাদের ভাবতে হবে—তরুণদের চিন্তা কোন পথে এগোচ্ছে, তাদের আদর্শ কারা, আর তারা কাদের অনুসরণ করছে?
যখন তরুণেরা জ্ঞান, পরিশ্রম ও সৎ কাজের চেয়ে বাহ্যিক চাকচিক্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে, তখন সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ থাকে। তরুণেরাই একটি জাতির আগামী দিনের চালিকাশক্তি। তাদের চিন্তা, চরিত্র ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়লে তার প্রতিফলন পুরো সমাজেই দেখা দিতে পারে।
ধর্ম নিয়েও আমাদের আত্মসমালোচনা করা দরকার। কেউ ধর্মের গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন; আবার কেউ ধর্মের নাম ব্যবহার করেও এমন আচরণ করেন, যার সঙ্গে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা ও মানবিকতার মিল নেই। তাই প্রশ্ন হলো—ধর্মের শিক্ষা কি আমাদের জীবনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে? আমরা কি কুরআন ও হাদিসের শিক্ষা শুধু মুখে ধারণ করি, নাকি আচরণেও তার প্রকাশ ঘটাই?
আমরা কুরআনের আয়াত, হাদিসের বাণী ও ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে জানি। কিন্তু সেই জ্ঞান কি আমাদের মধ্যে দয়া, ন্যায়বিচার ও দায়িত্ববোধ জাগাতে পেরেছে? আমরা কি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই? নিজের রাগ, অহংকার, হিংসা ও স্বার্থপরতা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখি?
জ্ঞান তখনই মানুষের প্রকৃত সম্পদ হয়ে ওঠে, যখন তা তার চরিত্র ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এ আত্মসমালোচনা শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়; আলেম, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের নেতৃত্বে থাকা প্রত্যেকের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।
আলিয়া ও কওমি—উভয় ধারার মাদ্রাসাশিক্ষা নিয়েও গঠনমূলক আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। কুরআন, তাফসির, হাদিস ও ফিকহের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সেই জ্ঞান অনুধাবন করা, জীবনে প্রয়োগ করা এবং মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, সনদ অর্জন কিংবা নির্দিষ্ট পেশায় প্রবেশের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তবে তার বৃহত্তর উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যেতে পারে। একজন আলেমের পরিচয় শুধু বক্তব্যে নয়; তাঁর জ্ঞান, আমল, বিনয়, সততা ও মানুষের সঙ্গে আচরণেও প্রকাশিত হওয়া উচিত। মঞ্চে বলা কথার প্রতিফলন বক্তার নিজের জীবনে থাকলে সেই কথার গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ে।
তবে সব আলেম বা সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এক কাতারে দাঁড় করানো ন্যায়সংগত নয়। যেখানে জ্ঞানের অপব্যবহার, স্বার্থপরতা, দুর্নীতি বা দায়িত্বহীনতা দেখা যায়, সেখানে ন্যায়সংগত ও গঠনমূলক সংশোধনের দাবি তোলা উচিত।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এক দল ক্ষমতায় আসে, আরেক দল ক্ষমতার বাইরে যায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত পরিবর্তন সব সময় আসে না। রাজনীতিকে যখন জনসেবার বদলে ক্ষমতা অর্জন বা ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের উপায় হিসেবে দেখা হয়, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করার সময় আমরা কি তাঁদের যোগ্যতা, সততা, অতীত কর্মকাণ্ড ও নৈতিক অবস্থান বিবেচনা করি? নাকি কখনো আবেগ, প্রচারণা, দলীয় পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত লাভের আশায় সিদ্ধান্ত নিই?
রাষ্ট্র পরিচালনায় এমন মানুষের প্রয়োজন, যাঁদের মধ্যে জ্ঞান, সততা, দক্ষতা, ন্যায়বোধ ও মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতা রয়েছে। পদ বা ক্ষমতা কাউকে আপনাআপনি যোগ্য করে তোলে না; বরং মানুষের যোগ্যতা ও কর্মই তাকে সেই দায়িত্বের উপযুক্ত করে।
পশ্চিমা বিশ্বের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের অনেক ক্ষেত্র থেকেই আমাদের শেখার আছে। তবে শেখা আর অন্ধ অনুকরণ এক বিষয় নয়। অন্যের ভালো অর্জন থেকে শিক্ষা নেওয়া দোষের নয়; জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগোতে পৃথিবীর নানা জাতির অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দরকার। একই সঙ্গে শেখার নামে নিজের বিবেক, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ বিসর্জন দেওয়া থেকেও সতর্ক থাকতে হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রসর হওয়া এবং নৈতিকভাবে উন্নত হওয়া—দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। আমরা আধুনিক হতে চাই, জ্ঞানী হতে চাই, উন্নত রাষ্ট্র গড়তে চাই। সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে মানবতা, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাকে রাখতে হবে।
ইসলাম শুধু ইবাদতের নিয়ম শেখায় না; মানুষের অধিকার রক্ষা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব পালন, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নিজের চরিত্র সংশোধনের শিক্ষাও দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন দয়া, ক্ষমাশীলতা, ন্যায়বিচার ও উত্তম আচরণের এক অনন্য আদর্শ তুলে ধরে। অথচ কখনো কখনো আমরা ধর্মের বাহ্যিক পরিচয় নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত শিক্ষা নিজের জীবনে ধারণ করতে ভুলে যাই।
মানবতার ক্ষেত্রেও আমরা অনেক সময় তার মূল্য বুঝতে দেরি করি। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বিশ্বাস ও সহমর্মিতা হারিয়ে গেলে শুধু বক্তৃতা দিয়ে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবু এখনো সময় আছে। আমরা চাইলে নিজেদের পরিবর্তন করতে পারি। সমাজ পরিবর্তনের জন্য শুধু অন্যের সমালোচনা যথেষ্ট নয়; পরিবর্তনের সূচনা হওয়া দরকার নিজের ভেতর থেকে।
তুমি যদি একজন মানুষকে সাহায্য করতে পারো, একজন অসহায় মানুষের চোখের জল মুছতে পারো, নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারো কিংবা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা থেকে বিরত থাকতে পারো—তাহলেই মানবতার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
অতএব, প্রিয় বন্ধু, অন্যের ভুল খোঁজার আগে একবার নিজের দিকে তাকাও। নিজেকে জানতে শেখো, বিবেককে জাগ্রত করো, নিজের রবকে চিনতে শেখো এবং তাঁর রাসুলের আদর্শকে জীবনে ধারণ করো।
মনে রেখো, মানবতা কোনো স্লোগানের নাম নয়; এটি মানুষের প্রতিদিনের আচরণে প্রকাশিত একটি গুণ। ধর্মের শিক্ষা শুধু কথায় নয়, জীবনের কাজেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
আমাদের সমাজ আমাদেরই তৈরি। তাই সমাজকে বদলাতে হলে প্রথমে নিজেদের বদলাতে হবে। পৃথিবীকে আলোকিত করতে হলে আগে নিজের হৃদয়ে একমুঠো আলো জ্বালাতে হয়।