#মধ্যরাতের_বিপর্যয়
#কলমে_নন্দিনী
অনেকক্ষন থেকেই কেমন যেনো একটা অস্বস্তি হচ্ছে অখিলেশ বাবুর। তখন থেকে হেঁটে চলেছেন কিন্তু পথ যেনো শেষ হচ্ছে না । মাঝে মাঝে রাস্তার আশেপাশে বেশ কিছু চেনা আবার বেশ কিছু অচেনা লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হচ্ছে। চেনাদের অনেকেই ওনার দিকে তাকিয়ে বেশ একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে আবার নিজেদের কাজে মন দিচ্ছেন। কিন্তু কেউ ওনার সাথে ঠিকমতো কথা বলছেন না। ফলে অখিলেশবাবু যে ওনাদের কিছু জিজ্ঞেস করবেন সেটাও পারছেন না। নিজের ওপর ভরসা করেই তাই হেঁটে চলেছেন । ভগবানের নাম নিয়ে নিজেকে বোঝালেন যা আছে কপালে দেখা যাবে। এগিয়ে যেতে থাকি আশা করি ঠিক পৌঁছে যাবো। বেশ কিছুটা পথ হাঁটার পর সন্ধ্যে নেমে এলো, দিনের আলো এবারে নিভুনিভু করছে। সূর্য্য তখন নিজের বাকসো গুছিয়ে পশ্চিমদিকে অস্ত যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছে। কিন্তু এখানে থামলে তো হবে না , অখিলেশ বাবুকে এগিয়ে যেতে হবে সামনেই একটা ফাঁকা মাঠ। মাঠটা পার হলে যদি কোনো লোকালয় চোখে পরে তাহলে সেখানে আজকের রাতটা কাটিয়ে দেবেন তারপর সকালে আবার বেরোবেন। হঠাৎ অখিলেশবাবু মনে করার চেষ্টা করলেন কোথায় যাবেন ভেবে বেরোলেন যেনো তিনি ? কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। সারাদিনের ক্লান্ত শরীর ছেড়ে দিচ্ছে এবারে কোনোভাবে মাঠটা পার করে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারলে তবেই যদি একটু সুস্থ লাগে। ধীরে ধীরে মাঠের মধ্যে প্রবেশ করলেন । একদম ফাঁকা মাঠ দূরদূরান্ত অবধি কিছুই দেখা যাচ্ছে না মাঝে মাঝে রাতের অন্ধকারে দূরে তাকালে অন্ধকারের ছায়া নিজে থেকেই তৈরী হয়ে চারপাশটাকে ঘিরে ধরছে। বারবার অখিলেশ বাবুর মনে হচ্ছে কেউ বুঝি ওনার পেছনে আসছে কিন্তু পেছন ঘুরতেই অন্ধকার আর শুধু অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই। ঝিঁঝিঁপোকাগুলো দূরে কোথাও ডেকে চলেছে অনবরত। অখিলেশ বাবু বেশ জোরে জোরে পা চালাচ্ছেন , তখন থেকে কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে কিন্তু বুঝে উঠতে পারছেন না সেটা কি। শরীরের ভেতরে এক তীব্র অশান্তি। নিজেকে সামলে কোনোভাবে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগলেন মাঠের ওই প্রান্তের দিকে।
বেশ কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে সামনে আরো বিপদ চোখের সামনে দেখতে পেলেন অখিলেশবাবু। মাঠের শেষে লোকালয় তো দূর দূর অবধি নেই বরং এরপর শুরু হচ্ছে জঙ্গল। এবারে কি করবেন তিনি ?? এদিকে তখন সন্ধ্যে শেষ হয়ে রাতের শুরু হচ্ছে , পিছিয়ে যাওয়ার উপায় তো নেই উল্টে এগিয়ে গেলেও তো বিপদ হতে পারে। এত রাতে জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করা কি ঠিক হবে?? কিন্তু অখিলেশবাবু কিছুতেই নিজেকে আটকাতে পারলেন না, ওনার মনে হলো উনি কেমনভাবে যেনো অন্য কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন। নিজেকে আটকাতে না পেরে জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করলেন । মাঠের থেকেও ঘন কালো অন্ধকারের চাদর আরো চারদিকটাকে ঘিরে ধরতে আসলো। অখিলেশ বাবুর শরীরের অস্বস্তি যেনো আরো বাড়ছে। এবারে তিনি কিছুটা বুঝতে পারলেন অস্বস্তির
কারণ, ওনার ঠাণ্ডা লাগছে খুব, শরীরটা হালকা হালকা কাঁপছে মাঝেমাঝে । এই জঙ্গলের মধ্যে ঠান্ডাটা যেনো জমিয়ে দিচ্ছে শরীরের সমস্ত হাড়গোড়। স্যাতসেতে মাটিতে মাঝে মাঝেই পা দুটো হালকা একটু ঢুকে যাচ্ছে। চারপাশে জঙ্গলী ঘাসগুলো লতিয়ে লতিয়ে সাপের মত এগিয়ে চলেছে। এমনভাবে গোটা জঙ্গলের মাটিতে আস্টেপিস্টে জড়িয়ে আছে তাতে মনে হচ্ছে গোটা জঙ্গলটা যেনো শুধু ওদেরই বাসস্থান। অখিলেশবাবু আরো কাঁপতে লাগলেন ঠাণ্ডায়,যতো রাত বাড়ছে আর যতো জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতে লাগলেন ততই যেনো ঠান্ডাটা একদম জাপটে ধরতে লাগলো। নিজের দুই হাতের তালু দুটোকে একটু জোড়ে ঘষতে লাগলেন। যাতে ঠাণ্ডায় জমে থাকা হাতদুটোতে একটু গরমের অনুভুতি আনতে পারেন। অখিলেশবাবু ঊর্ধ্বশ্বাসে হাঁটছেন বরং বলা যায় রীতিমত দৌড়াচ্ছেন । তাড়াতাড়ি এই জঙ্গল পার হতে পারলেই তবেই যদি রাত কাটানোর মতো একটা জায়গা পাওয়া যায়। মাঝে মাঝেই জঙ্গলের মাঝখান থেকে নানা জঙ্গলী জানোয়ারের আওয়াজ কানে আসছে ওনার। এতো গভীর জঙ্গল , জন্তু জানোয়ার তো থাকবেই।
বেশ কিছুক্ষন হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের মাঝে এসে পড়লেন অখিলেশবাবু। ঠাণ্ডায় এবারে ভেতরের অস্তিমজ্জা অব্দি কাঁপছে ওনার । জঙ্গলের মাঝখানটা বেশ ফাঁকা , ঠিক পাহাড়ের ভ্যালির মতো। চারপাশে বড়ো বড়ো গাছের মাঝে একটা বেশ বড় ফাঁকা জায়গা। এটাকে খেলার গ্যালারি বললেও ভুল হবে না। একটু থেমে চারপাশটা ভালো করে দেখলেন ,মনে হলো কেউ যেনো ইচ্ছে করেই থামিয়ে দিলো ওনাকে। উচ্চরক্তচাপের রুগী অখিলেশবাবু থেমে গিয়ে জোরে জোরে শ্বাস- প্রশ্বাস নিতে লাগলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য এত জোরে হাফাচ্ছেন কিন্তু ঠান্ডাটা আগে যেভাবে তাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিলো এখনো সেভাবেই কাঁপিয়ে দিচ্ছে। এত জোরে হাঁটার পরেও এইরকম কনকনে ঠান্ডা লাগছে কেনো শরীরে ?? একটা গাছের তলায় একটু বসলেন, আবার হাঁটা শুরু করবেন একটু পরে। শরীর আর দিচ্ছে না , এই বয়সে এতরকমের শরীর খারাপ নিয়ে কি আর পারা যায়?? অথচ কিছুতেই মনে পড়ছে না কোথায় যাচ্ছেন তিনি?? কেনো যাচ্ছেন??কিন্তু যাচ্ছেন কোনো কাজে , কেউ ওনাকে বাধ্য করছে যেতে। অন্ধকারে গাছের পাতা, লতানো গাছগুলো ছায়ার মতো জড়িয়ে পেঁচিয়ে এক একটা মানুষের অবয়ব তৈরি করেছে। হঠাৎ অন্ধকারে সামনের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে কেউ দাঁড়িয়ে আছে । বেশ কয়েকবার ভয় পেয়েছিলেন তারপর ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাচ্ছে এটা কেউ নয় গাছের নানারকম অবয়ব।
কিন্তু এবারে কাউকে একটা অনেকক্ষন থেকে লক্ষ্য করছিলেন তিনি । বারবার চোখ কচলে বোঝার চেষ্টা করছিলেন চোখের ভুল নাকি সত্যিই কেউ দাঁড়িয়ে আছে ?? একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষন থেকে , নড়ছে না বিন্দুমাত্র। বার কয়েক নিজেকে বোঝালেন কে দাঁড়িয়ে থাকবে এভাবে ?? নিশ্চয় চোখের ভুল হচ্ছে। কিন্তু না !! অখিলেশবাবু বেশ ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলেন এতক্ষন ধরে নড়ছে না সেই বস্তুটি। বেশ কিছুক্ষন উল্টোদিকের সেই অবয়বটিকে দেখার পর এবারে অখিলেশ বাবুর বুক ঢিপঢিপ করতে লাগলো, শরীর দিয়ে ঘাম ঝরছে ভয়ে , অথচ ঠাণ্ডায় কাঁপছেন তিনি। কি আশ্চর্য !! জ্বর হলে এইরকম হয় অনেকটা । বাইরে ঘাম হচ্ছে আর ভেতরে ঠাণ্ডায় কাঁপুনি দিচ্ছে। উঠে দাঁড়িয়ে একবার চিৎকার করলেন ” এই কে রে ?? কে ওখানে ??” কিন্তু যতটা জোরে চিৎকার করার চেষ্টা করলেন ততটা জোরে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না। অথচ কি আশ্চর্য সেই অবয়বটি একভাবে দাঁড়িয়ে আছে ওখানেই। অন্ধকারে বুঝতে পারছেন না তিনি একটু কি এগিয়ে যাবেন? জন্তু জানোয়ার বলে তো মনে হচ্ছে না । তাহলে কি আছে ?? নাহ একবার সাহস করে এগিয়ে যাওয়া যাক। যা আছে কপালে দেখা যাবে এতদূর তো এসেছেন ! দুগ্গা দুগ্গা বলে দুইপা একপা করে এগোতে লাগলেন অখিলেশ বাবু। দুই একবার চিৎকার করতে চাইলেন কিন্তু কিছুতেই গলা দিয়ে জোরে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। ঠান্ডাটা আরো বাড়ছে , কাঁপুনিটাও আগের থেকে বেড়ে যাচ্ছে , কিছুতেই আটকানো যাচ্ছে না । শরীরের তাপমাত্রা নেমে যাচ্ছে ঠাণ্ডায়। ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে সেই ছায়ার অবয়বের কাছে এগিয়ে গেলেন। বেশ কিছুটা কাছে গিয়ে ওনার মনে হলো কেউ একটা মোটা কম্বল জাতীয় কিছু গায়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আবার ডাকার চেষ্টা করলেন অখিলেশ বাবু, ডাকবেন কিভাবে ?? দাঁত অবধি ঠকঠক করে কাঁপছে। কথা বলার বা আওয়াজ করার শক্তি নেই। অবয়বটি নড়ছে না দেখে এবারে একদম তার কাছে চলে গেলেন তিনি , সে মাথা মুড়ি দিয়ে নিজেকে সেই মোটা কাপড়ে লেপটে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটাও দেখা যাচ্ছে না।
অখিলেশবাবু প্রথমে একবার হাত দিয়ে হালকা ঠোকা মারলেন ওই দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটির গায়ে , হ্যাঁ অখিলেশ বাবু এবারে নিশ্চিত হলেন কোনো মানুষ বটে। মানুষটি একটু নড়ে উঠলো , একটু সরে গিয়ে আবার একভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। অখিলেশ বাবুর সাহসটা একটু যেনো বেড়ে উঠলো , এবারে একদম কাছে গিয়ে জোরে জোরে দুইবার ধাক্কা দিলেন । নাহ, যেমন ছিল সেইরকম আবার। অদ্ভুত তো!! কিছু দাবী না থাকলে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে কেনো?? অখিলেশবাবুর কাঁপতে থাকা গলায় কেঁপে কেঁপে কিছু একটা বললেন। কিন্তু ঠিক স্পষ্ট শোনা গেলো না। এবারে রাগে অখিলেশবাবু ওর গায়ের মোটা চাদর বা কম্বল জাতীয় জিনিসটাকে নিয়ে টানার চেষ্টা করলেন , যাতে মুখটা দেখা যায়। কে দাঁড়িয়ে আছে এভাবে ?? বেশ কিছুক্ষন চেষ্টা করে তবে ঢাকা মুখের কিছুটা বেরিয়ে আসলো । আরে সুরঞ্জনা !! এই মাঝরাতে এখানে কি করছে?? নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে এখানে দেখে অবাক তো হলেন তার সাথে খুশিও হলেন । ভাবলেন যাক একলা যে ভয় পাচ্ছিলেন সেটা আর হবে না। দুজনে মিলে ঠিক এগিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু সুরঞ্জনা জানলো কিভাবে অখিলেশ বাবু এখানে আছেন ?? তিনি তো কাউকে জানিয়ে আসেন নি। অতো ভেবে কাজ নেই , আপাতত ঠাণ্ডায় নিজেকে ওই মোটা চাদরে জড়িয়ে নিতে পারলেই হলো। আর টিকে থাকা যাচ্ছে না। সুরঞ্জনার গায়ের চাদরটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করলেন কিন্তু কিছুতেই ওনার স্ত্রী সেটাকে হাতছাড়া করতে রাজি হলেন না। বেশ কিছুক্ষন টানাটানির যুদ্ধ চলার পর এবারে অখিলেশবাবুর স্ত্রী ওপরের দিকে মুখটা তুলে রক্তাক্ত নয়নে নিজের স্বামীর দিকে তাকালেন । গায়ের মোটা কম্বলটা নিয়ে টানাটানি করার জন্য সুরঞ্জনা রাগে অখিলেশবাবুর পেটের মধ্যে পা দিয়ে একটা লাথি মারতেই অখিলেশবাবু ছিটকে গিয়ে পড়লেন বেশ কিছুটা দূরে।
ধড়পড় করে উঠে বসলেন অখিলেশ বাবু , খাট থেকে সোজা গিয়ে পড়েছেন মেঝেতে, বেশ জোরেই লেগেছে শরীরের কয়েকটা জায়গায় , কোনরকমে চোখ কচলে উঠে বসলেন।ঘুম জড়ানো চোখে নিজের খুলে যেতে থাকা লুঙ্গির একটা অংশ ধরে সেটাকে জড়িয়ে টেনে তুলে নিজের লজ্জা নিবারণ করার চেষ্টা করলেন। চারপাশটা একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখে নিয়ে নিশ্চিত হলেন যে তিনি নিজের ঘরেই রয়েছেন কোনো জঙ্গলে না। স্ত্রী সুরঞ্জনা তখন খাটের ওপর ওনাদের দুজনের গায়ের কম্বলটার পুরোটা একলা নিজের গায়ে জড়িয়ে নিয়ে নাক ডেকে ডেকে ঘুমোচ্ছে। ঘুমের ঘোরে নিজের স্বামীর যে এই অবস্থা করেছেন সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারেন নি। মাঘ মাসের ঠাণ্ডায় এতক্ষন ধরে বেচারা অখিলেশবাবু কোনরকম গায়ের ঢাকা ছাড়াই ঘুমোচ্ছিলেন বলেই স্বপ্নের মধ্যেও ঠাণ্ডায় কাঁপছিলেন। নিজেকে মেঝে থেকে তুলে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন ,উফফ কি শান্তি ভাগ্যিস তিনি নিজের ঘরে আছেন কোনো অন্ধকার জঙ্গলে না। স্ত্রী কে দ্বিতীয়বার আবার জ্বালানোটা খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হলো না। কম্বলের আশা ত্যাগ করে নিজের লুঙ্গিটাকে কোনরকমে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বিছানায় জড়সড় হয়ে শুয়ে পড়লেন। ভাগ্যিস কোনো জঙ্গলে নেই তিনি ,আঃ নিজের বিছানায় কি শান্তির ঘুম হয় !!
কলমে – নন্দিনী 😐🖋️🖋️🖋️