Sablu Shahabuddin

সবাই কবি হতে পারে না, কেউ কেউ কবি হয়
শাবলু শাহাবউদ্দিন

১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ (২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রি.) রোজ শুক্রবার দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ছয়জন বিশিষ্ট কবির কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাসমূহ পড়ে মনে হলো কবিদের কবিতার সৌন্দর্যের কিংবা বাস্তবিক কবিতা হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোথাও না কোথাও কিছুটা হলেও কমতি রয়েছে। সালেহ আহমদ-এর লেখা ‘শনিবারের আড্ডা’ কবিতাটির একদম শেষ লাইনে কবি লিখেছেন: “পয়ারের নরম তুলতুলে শব্দের কবিতা শোনাব”। কবি নিজেই যেহেতু এখানে ‘পয়ার’ ছন্দের কথা উল্লেখ করেছেন, সেহেতু কবিতাটির গঠনে পয়ারের বৈশিষ্ট্য (প্রতি লাইনে ১৪ অক্ষর এবং ৮+৬ মাত্রার বিন্যাস) থাকা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু পুরো কবিতাটি মুক্তক বা গদ্যছন্দে লেখা হয়েছে, যেখানে অক্ষরের কোনো নির্দিষ্ট হিসাব রাখা হয়নি। এটি কোনো ভুল নয় (আধুনিক কবিতায় এমনটা হয়), তবে পয়ারের উল্লেখ থাকায় পাঠক প্রথাগত ছন্দ খুঁজতে পারেন। প্রথম স্তবকের চতুর্থ লাইনে “তরুণ এক কবির সাথে” এর পর একটি কমা (,) বা ড্যাশ (—) দিলে পরের লাইনের সাথে সংযোগটি আরও স্পষ্ট হতো। দ্বিতীয় স্তবকের তৃতীয় লাইনে “নাকি রাজনীতি কবিতাকে?” এর পর একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?) দেওয়া আছে, যা যৌক্তিক। কিন্তু তার ঠিক পরের লাইনে “আপনি ফলবতী গাছের মতো মাথা নুয়ে,”—এখানে কমার বদলে একটি ড্যাশ (—) ব্যবহার করলে বক্তব্যের গভীরতা আরও ভালো প্রকাশ পেত। হ্যাঁ, আরেকটা বিষয়; এই আধুনিক যুগে এসে আপনি একজন নারীকে এত ছোট করে দেখতে পারেন না। নিজে লিখছেন আধুনিক কবিতা কিন্তু একজন নারী কেন আপনার চোখে এখনো আধুনিক হতে পারল না? উনুন সামলাবে, ভয়ে-লজ্জায় মুখ নিচু করে টেবিলের শেষ প্রান্তে বসবে, কণ্ঠ হবে নিম্নগামী, অবলার মতো পরতে হবে সাদা শাড়ি? কিন্তু কেন? নিজের মন থেকে নারীজাতিকে সম্মানের চোখে দেখা উচিত।
নিজাম বিশ্বাস-এর লেখা ‘রূপবতী’ কবিতাটি বেশ রূপকধর্মী এবং আবেগপূর্ণ। রূপকধর্মী কবিতার পাঠক সব সময় চান ছন্দ, লয় এবং অন্ত্যমিল মিলিয়ে তা হৃদয়ে গেঁথে রাখতে, যা ‘রূপবতী’ কবিতায় পাঠক খুঁজে পাবেন না। কবিতাটিতে সর্বনামের ব্যবহারে প্রথমে দূর সম্পর্ক দৃশ্যমান হলেও পরে আপন সম্পর্ক দেখা গেছে, যা পাঠকের মনে প্রশ্ন তুলতে পারে। আবার কোথাও বিরামচিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে অযাচিতভাবে, কোথাও আবার বিরামচিহ্নের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ব্যবহার করা হয়নি। ‘আসো’ কিংবা ‘মতো’ শব্দের পরিবর্তে ‘বসো’ শব্দটি ব্যবহার করলে হয়তো কবিতার নান্দনিকতা বৃদ্ধি পেত। ‘রূপবতী’ কবিতায় উপমার ভুল প্রয়োগও পরিলক্ষিত হয়েছে।
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘ধানদুধ’ কবিতায় উপমার ভুল প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়েছে। কবিতার নান্দনিকতার দিকে মোটেও খেয়াল রাখা হয়নি। আধুনিক কবিতা মানে এই নয় যে জোর করে কয়েকটি শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে বলে দিলাম এটা একটা কবিতা—এমন কিন্তু নয়। ইঞ্জিনবিহীন উড়োজাহাজ কি আকাশে উড্ডয়ন করে? নিশ্চয়ই করে না। ভাবের গভীরতা আছে, কিন্তু শ্রুতিমধুরতা কোথায়? শ্রুতিমধুরতা কিন্তু কবিতার একটা প্রাণ।
নাজমুল আমীন-এর লেখা “জননী—তোমার মায়াবী হাত” কবিতাটি পড়ে মনে হলো এ যেন উপনিষদের বিস্ময়কর শ্লোক! অপ্রচলিত শব্দের সমারোহ, প্রাঞ্জলতার কোনো বালাই নেই। শব্দগুলোকে জোর করে একটির পর আরেকটি বসিয়ে দিয়ে কবি নিজেকে রক্ষা করেছেন। আধুনিক কবিতায় সুর, ছন্দ, তাল, লয়, অন্ত্যমিল কিছুরই কি থাকার দরকার নেই? শুধু কি ভাবের গভীরতা দিলেই একটা কবিতার জন্ম হয়?
সুশান্ত মজুমদারের “স্বগতোক্তি/এগারো” কবিতাটি মূলত একটি তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার কবিতা। এটি সমাজের চরম অবক্ষয়, বাক্‌-স্বাধীনতা হরণ, মেধার অবমূল্যায়ন এবং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের এক অন্ধকার দলিল। কবি সবকিছুর মাঝে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখতে পেলেও কবিতার মাঝে এগুলো খুঁজে পান না। “স্বগতোক্তি/এগারো” কবিতাটি সম্পর্কে প্রথমত প্রশ্ন জাগে—এটি কি সত্যি একটা কবিতা, নাকি প্রবন্ধ? কবিতার একটা নিজস্ব গঠনরীতি আছে, “স্বগতোক্তি/এগারো” কবিতাটিতে যা রক্ষা করা হয়নি। কবিতা আর প্রবন্ধের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত আছে, যা মনে হয় কবি নিজে মানতে নারাজ।
রাজীব আর্জুনির “সাধক মাছ, কাকতাড়ুয়া” কবিতাটি একটি আধুনিক কবিতা। আইরিশ নাট্যকার এবং লেখক স্যামুয়েল বেকেটের লেখা “ওয়েটিং ফর গোডো” পড়েছিলাম। নাটক হিসেবে এটি সার্থক; কিন্তু নাটকের প্রধান দুই চরিত্র ভ্লাদিমির এবং এস্ট্রাগন ‘গোডো’র জন্য অপেক্ষা করে যা করে, তা যে এই আধুনিক যুগে কতটুকু যৌক্তিক, তার হিসাব কে মিলিয়ে দেখবে? “সাধক মাছ, কাকতাড়ুয়া” কবিতায় মূলভাব বা মূল চেতনা (Theme) ছাড়া আর কিছু পাঠক খুঁজে পাবেন বলে মনে হয় না। কবিতা লেখার জন্য আসলে কী দরকার, তা কি কবি সাহেব ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?
একটি কবিতা তখনই কবিতা হতে পারবে, যখন তার মধ্যে তাল, লয়, অন্ত্যমিল, শ্রুতিমধুরতা, ভাব ও আবেগ, সংক্ষিপ্ততা ও ঘনত্ব, চিত্রকল্প ও উপমা, শব্দচয়ন ও পরিমিতিবোধ, নির্দিষ্ট কাঠামো, সহজবোধ্যতা ও আকর্ষণ এবং পাঠকের মনোরঞ্জন ইত্যাদি থাকবে।
কবিতা লেখা কিছুটা ঐশ্বরিক শক্তির ব্যাপার, যা কেবল ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে। তাই সবাই কবি হতে পারে না, কেউ কেউ কবি হয়। জোর করে কিছু শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে কোনো ভাব বা আবেগকে কেবল প্রকাশ করার নাম কখনো কবিতা হতে পারে না। কবিতা কেবল সেই লিখতে পারে, যার মধ্যে কবিত্ব আছে; আর বাকিরা হবে কেবল লেখক, কবি নয়।

শাবলু শাহাবউদ্দিন
কবি ও গল্পকার
বৈদেশিক ডাক অফিস, ঢাকা জিপিও, ঢাকা-১০০০
+৮৮০১৫৬৮৩৮৭৬০৯

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...