সাহিত্য ও সাহিত্যিক

টমাস ক্যাম্পবেল (Thomas Campbell, ১৭৭৭–১৮৪৪)

১. ইংল্যান্ডের নাবিকেরা

ইংল্যান্ডের নাবিকেরা, সমুদ্রের বুকে বীর,
ঝড় তুলে লড়ো তুমি, জয় করো অন্ধকারের তীর।
পতাকা উড়ুক বাতাসে, তরবারি ঝলসে উঠুক,
ব্রিটেনের নামে গর্জে উঠুক তোমার হৃদয়ের ঢেউ।
যুদ্ধের ঝড়ে দাঁড়াও তুমি, অটল পাহাড়ের মতো,
শত্রুর বুকে ভয় জাগাও — ইংল্যান্ডের সন্তান তুমি!

২. বাল্টিকের যুদ্ধ

বাল্টিক সাগরে ঝড় উঠেছে, জাহাজ দুলছে প্রবল,
কামানের গর্জন মিশে গেছে ঢেউয়ের চিৎকারে।
বীরেরা দাঁড়িয়ে আছে, মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে,
পতাকা রক্তে রাঙা হয়, তবু হার মানে না কেউ।
ছন্দময় যুদ্ধের গান বাজে বাতাসে আজ,
বাল্টিক সাক্ষী — ব্রিটেন জিতেছে, শত্রু পালিয়েছে আজ!

৩. হোহেনলিন্ডেনের তুষারযুদ্ধ

তুষারে ঢাকা মাঠ, রক্তের লাল ছাপ পড়েছে,
কামানের আগুন জ্বলে উঠেছে শীতের রাতে।
সৈনিকেরা লড়ছে, মৃত্যুকে বুকে টেনে নিয়ে,
প্রতিটি পদক্ষেপে গর্জে উঠছে যুদ্ধের ছন্দ।
হোহেনলিন্ডেন — নামটি আজও কাঁপায় হৃদয়,
বীরত্বের গান গেয়ে যায় ক্যাম্পবেলের কলম।

৪. সৈনিকের স্বপ্ন

যুদ্ধের মাঠে ক্লান্ত সৈনিক শুয়ে আছে,
চোখ বন্ধ করে দেখে সে সুদূর গ্রামের বাড়ি।
স্ত্রীর হাসি, শিশুর কোল, শান্তির সোনালি আলো —
যুদ্ধের আগুন ভুলিয়ে দেয় মুহূর্তের জন্য।
স্বপ্ন ভাঙে কামানের শব্দে, আবার যুদ্ধে ফিরে যায়,
তবু হৃদয়ে বাজে সেই স্বপ্নের মধুর সুর।

৫. আয়ারল্যান্ডের নির্বাসিত

আয়ারল্যান্ড ছেড়ে দূর সমুদ্রে ভেসে যায় সে,
মাতৃভূমির স্মৃতি বুকে নিয়ে, চোখে জলের ধারা।
শত্রুর অত্যাচারে ঘর হারিয়েছে, দেশ হারিয়েছে,
তবু গান গায় সে — স্বাধীনতার স্বপ্নের গান।
ক্যাম্পবেলের কলমে জেগে উঠেছে তার কষ্ট,
নির্বাসিতের হৃদয়ে আজও জ্বলে আশার আলো।

৬. পোল্যান্ডের জন্য হৃদয়

পোল্যান্ডের আকাশে রক্তের মেঘ জমেছে আজ,
ওয়ারশ পতনের খবরে কাঁপছে ক্যাম্পবেলের বুক।
স্বাধীনতার জন্য লড়ছে তারা, মৃত্যুকে তুচ্ছ করে,
তবু বিশ্ব চুপচাপ — কবি বলে, “এ অন্যায়!”
হৃদয় রাতদিন পোল্যান্ডের জন্য কাঁদে,
স্বাধীনতার গান লেখে তিনি — চিরকালের জন্য।

৭. লর্ড উলিনের কন্যা

লর্ড উলিনের কন্যা পালায় প্রেমিকের সাথে,
ঝড়ের রাতে নৌকা চলে সমুদ্রের বুকে।
পিতার ক্রোধ, প্রেমের আগুন — দুইয়ে মিলেছে যুদ্ধ,
ঢেউয়ের গর্জনে মিশে যায় তাদের শেষ কথা।
ছন্দময় ব্যালাডে বেজে ওঠে ভাগ্যের খেলা,
ক্যাম্পবেলের কলমে অমর হয় প্রেম-বিদ্রোহ।

৮. আশার আনন্দ

আশা — মানুষের বুকে চিরন্তন আলোর দীপ,
অন্ধকারে হারিয়ে গেলেও জ্বলে ওঠে আবার।
যুদ্ধ, দাসত্ব, অত্যাচার — সব ভেঙে দেয় সে,
নতুন দিনের স্বপ্ন দেখায়, নতুন পথ দেখায়।
ক্যাম্পবেলের প্রথম কাব্যে বেজেছে এই সুর,
আশার গান আজও গায় হৃদয় — অটুট, অবিচল।

৯. স্কটিশ কবির যুদ্ধগান

গ্লাসগো থেকে লন্ডনের পথে হেঁটে এসেছে সে,
হৃদয়ে বাজে যুদ্ধের ছন্দ, দেশপ্রেমের সুর।
কলম ধরে লেখে সে — সমুদ্রের গান, তুষারের যুদ্ধ,
সৈনিকের স্বপ্ন, নির্বাসিতের বেদনা।
স্কটল্যান্ডের মাটি থেকে জন্ম নিয়েছে এই কবি,
যার গান আজও জাগায় বুকে — বীরত্বের আগুন।

১০. ক্যাম্পবেলের উত্তরাধিকার

যুদ্ধের গান লিখে গেছে সে, ছন্দে-ছন্দে উদ্দীপনা,
নাবিক, সৈনিক, নির্বাসিত — সবার হয়ে কথা বলেছে।
শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে, পোল্যান্ডের পক্ষে দাঁড়িয়েছে,
ওয়েস্টমিনস্টারের কোণে চিরকালের জন্য ঘুমিয়েছে।
তবু তার গান বাজে আজও — সমুদ্রে, যুদ্ধক্ষেত্রে, হৃদয়ে,
টমাস ক্যাম্পবেল — ছন্দময় যুদ্ধকাব্যের অমর কবি!


স্কটিশ কবি, যাঁর উদ্দীপক, ছন্দময় যুদ্ধকাব্য ও দেশপ্রেমিক গান আজও জাতীয় স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে

টমাস ক্যাম্পবেল ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অন্যতম জনপ্রিয় স্কটিশ কবি। তিনি তাঁর উদ্দীপক, ছন্দময় যুদ্ধকাব্য (martial war lyrics) এবং দেশপ্রেমিক গানের জন্য সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় — যেমন Ye Mariners of England, The Battle of the Baltic ও Hohenlinden। এই গানগুলো শুধু কবিতা নয়, যুদ্ধক্ষেত্রে ও নৌবাহিনীতে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন দীর্ঘ কাব্যের রচয়িতা, সাংবাদিক, সম্পাদক, শিক্ষাবিদ এবং মানবিক অধিকারের সমর্থক। তাঁর রচনায় নব্যধ্রুপদী (neoclassical) ছন্দ ও রোমান্টিক অনুভূতির মিশ্রণ ঘটেছে।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

২৭ জুলাই ১৭৭৭ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরের হাই স্ট্রিটে জন্মগ্রহণ করেন টমাস ক্যাম্পবেল। তিনি ছিলেন আলেকজান্ডার ক্যাম্পবেল ও মার্গারেট ক্যাম্পবেলের একাদশ সন্তান (সবচেয়ে ছোট)। পিতা আলেকজান্ডার ছিলেন একজন বণিক; তিনি ভার্জিনিয়ায় তামাকের ব্যবসা করতেন। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয় এবং পরিবার প্রায় ২০,০০০ পাউন্ড হারায়। পিতা ছিলেন দার্শনিক টমাস রিডের ঘনিষ্ঠ বন্ধু — এজন্যই কবির নাম রাখা হয় টমাস। মাতা মার্গারেট ছিলেন সাহিত্য ও সংগীতপ্রেমী; তাঁর প্রভাবে ক্যাম্পবেলের সাহিত্যিক রুচি গড়ে ওঠে।

শিক্ষা ও যুবকাল

গ্লাসগো হাই স্কুল ও গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ক্লাসিক্স ও কাব্য রচনায় পুরস্কার লাভ করেন। ছুটির সময় পশ্চিম হাইল্যান্ডসে গৃহশিক্ষকতা করতেন। এ সময় তিনি Glenara ও Ballad of Lord Ullin’s Daughter-এর মতো কবিতা লেখেন। ১৭৯৭ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে বক্তৃতা শোনেন, কিন্তু সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ বেশি ছিল। এডিনবার্গে তিনি স্যার ওয়াল্টার স্কট, হেনরি ব্রাফাম, ফ্রান্সিস জেফ্রি প্রমুখের সঙ্গে পরিচিত হন। এই সময় তিনি The Wounded Hussar, The Dirge of Wallace ইত্যাদি লেখেন।

প্রথম বড় সাফল্য: The Pleasures of Hope (১৭৯৯)

১৭৯৯ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বড় কাব্য The Pleasures of Hope। এটি heroic couplet-এ রচিত দীর্ঘ কবিতা — আশা, ফরাসি বিপ্লব, পোল্যান্ডের বিভাজন, দাসপ্রথা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। কবিতাটি তাৎক্ষণিকভাবে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ক্যাম্পবেলকে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ও খ্যাতি এনে দেয়। এটি তাঁর নব্যধ্রুপদী শৈলীর নিদর্শন।

ইউরোপ ভ্রমণ ও যুদ্ধকাব্যের জন্ম (১৮০০)

১৮০০ সালে জার্মানি ভ্রমণ করেন। হামবুর্গ, রেগেনসবার্গ (ফরাসি বাহিনীর দখলে পড়ার ঠিক আগে) এবং আলটোনায় অবস্থান করেন। এই ভ্রমণ তাঁর কাব্যজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

এ সময় তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত যুদ্ধকাব্য ও দেশপ্রেমিক গান:

  • Ye Mariners of England — ব্রিটিশ নৌসেনাদের উদ্দেশে উদ্দীপক গান। ছন্দময়, শক্তিশালী, দেশপ্রেমে ভরপুর।
  • The Battle of the Baltic — ডেনমার্ক-ব্রিটেন যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত নৌযুদ্ধের গান।
  • Hohenlinden — ১৮০০ সালের হোহেনলিন্ডেনের যুদ্ধের বর্ণনা। শীতের যুদ্ধক্ষেত্র, রক্তাক্ত তুষার, বীরত্ব — সব মিলিয়ে অসাধারণ ছন্দ ও চিত্রকল্প।
  • The Soldier’s Dream — যুদ্ধের ক্লান্ত সৈনিকের স্বপ্নের কথা (পরে বিটোফেন সুরারোপ করেন)।
  • The Exile of Erin — আইরিশ নির্বাসিতদের প্রতি সহানুভূতি।

এই গানগুলোর উদ্দীপক, ছন্দময়, martial চরিত্র তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সুরারোপযোগ্য ছন্দ, সহজ ভাষা ও দেশপ্রেমের আবেগ এগুলোকে জনপ্রিয় গানে পরিণত করে।

লন্ডনে স্থায়ী বসবাস, বিবাহ ও পারিবারিক জীবন

১৮০৩ সালে দ্বিতীয় চাচাতো বোন মাতিল্ডা সিনক্লেয়ারকে বিয়ে করেন। লন্ডনে বসবাস শুরু করেন। ১৮০৫ সালে সরকারি পেনশন (২০০ পাউন্ড) পান। সিডেনহ্যামের পিক হিলে বাড়ি করেন। দুই পুত্রের মধ্যে একজন শৈশবে মারা যান, অন্যজন মানসিক ভারসাম্য হারান। ১৮২৮ সালে স্ত্রী মাতিল্ডা অল্প বয়সে মারা যান — এটি তাঁর জীবনে বড় আঘাত।

পরবর্তী প্রধান কাব্যকর্ম

  • Gertrude of Wyoming (১৮০৯): স্পেনসেরিয়ান স্তবকে রচিত দীর্ঘ আখ্যানকাব্য। পেনসিলভানিয়ার ওয়াইওমিং উপত্যকায় ১৭৭৮ সালের গণহত্যার পটভূমিতে। প্রকৃতি, প্রেম ও ট্র্যাজেডির মিশ্রণ। সমসাময়িকদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও পরে সমালোচিত হয় অতিরিক্ত বিস্তারের জন্য।
  • Theodric (১৮২৪): পারিবারিক জীবনের কবিতা।
  • The Pilgrim of Glencoe (১৮৪২): শেষ বড় আখ্যানকাব্য।

তাঁর ছোট গানগুলোই বেশি স্থায়ী হয়েছে।

সাংবাদিকতা, সম্পাদনা ও সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড

১৮০৫ সাল থেকে The Star পত্রিকায় বিদেশি সংবাদ অনুবাদ করতেন। ১৮১৯ সালে প্রকাশ করেন Specimens of the British Poets — ব্রিটিশ কবিদের নির্বাচিত রচনা ও সমালোচনামূলক প্রবন্ধসহ। ১৮২০–১৮৩০ সাল পর্যন্ত সম্পাদনা করেন The New Monthly Magazine। ১৮৩১ সালে The Metropolitan Magazine চালু করেন (সফল হয়নি)। ১৮১২ সালে রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে কাব্য বিষয়ে বক্তৃতা দেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান

ক্যাম্পবেল ছিলেন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (London University)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। জার্মানির শিক্ষাব্যবস্থা অধ্যয়ন করে লর্ড ব্রাফামকে সুপারিশ পাঠান। ১৮২৬–১৮২৯ সালে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের লর্ড রেক্টর নির্বাচিত হন (স্যার ওয়াল্টার স্কটকে হারিয়ে)। শিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ ও আধুনিকীকরণে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

পোল্যান্ড সমর্থন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি

The Pleasures of Hope-এ পোল্যান্ডের পক্ষে কথা বলেছিলেন। ১৮৩১ সালে রাশিয়ার হাতে ওয়ারশ পতনের পর গভীরভাবে আহত হন। “Poland preys on my heart night and day” — এমন কথা লিখেছিলেন। Literary Association of the Friends of Poland-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। হল্যান্ড হাউসের হুইগ সমাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

শেষ জীবন, দুর্ভাগ্য, মৃত্যু ও সমাধি

স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। ১৮৩৪ সালে প্যারিস ও আলজিয়ার্স ভ্রমণ করেন (Letters from the South, ১৮৩৭)। ১৮৪৪ সালের ১৫ জুন ফ্রান্সের বুলোন-সুর-মেরে (Boulogne-sur-Mer) মারা যান। ৩ জুলাই ১৮৪৪ সালে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবির Poets’ Corner-এ সমাহিত করা হয়।

উত্তরাধিকার ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন

জীবদ্দশায় ক্যাম্পবেল অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর যুদ্ধকাব্যগুলো জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায়। পরবর্তীকালে ওয়ার্ডসওয়ার্থ-কলরিজের রোমান্টিক আন্দোলনের ছায়ায় কিছুটা ম্লান হয়ে যান, কিন্তু দেশপ্রেমিক গান ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয় থেকে গেছেন। ফ্রান্সিস জেফ্রি একবার তাঁকে লিখেছিলেন যে তিনি নিজের ধারণাকে অতিরিক্ত পরিশীলিত করে ফেলেন — অর্ধেক জাঁকজমক হারিয়ে যায়। তবু তাঁর ছন্দের দক্ষতা, যুদ্ধের চিত্রকল্প এবং মানবিক সহানুভূতি আজও পাঠককে আকর্ষণ করে।

টমাস ক্যাম্পবেল ছিলেন একজন কবি যিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বীরত্বকে ছন্দের মাধ্যমে অমর করে রেখেছেন, একই সঙ্গে শিক্ষা ও স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করেছেন। তাঁর কবিতা শুধু সাহিত্য নয় — ইতিহাস ও জাতীয় চেতনার অংশ হয়ে উঠেছে।

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...