টমাস চ্যাটারটন (Thomas Chatterton, ১৭৫২–১৭৭০)
চ্যাটারটনের “টমাস রাউলি” ছদ্ম-মধ্যযুগীয় কবিতার রহস্যময় ভাষা, মধ্যযুগীয় পরিবেশ, প্রতিভার ট্র্যাজেডি ও অপূর্ণ যৌবনের ভাবনা অনুসরণ করে এই দশটি ছোট কবিতা রচিত।
১. রাউলির গান
আমি রাউলি, পুরনো সন্ন্যাসী,
মধ্যযুগের ধুলোয় লেখা গান গাই।
পুরনো চার্চের দেওয়ালে ছায়া পড়ে,
কবিতার অক্ষরে জীবন ফিরে আসে আবার।
২. কিশোর প্রতিভার মৃত্যু
সতেরো বছরের হাতে কলম কাঁপে,
লন্ডনের অ্যাটিকে আর্সেনিকের ছায়া নামে।
প্রতিভা যখন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়ে,
তখন মৃত্যুই হয় একমাত্র মুক্তির পথ।
৩. লন্ডনের অ্যাটিক ঘর
ছোট্ট ঘরে জানালা খোলা, শহরের আলো দূরে,
খাবার নেই, শুধু কাগজ আর কালির গন্ধ।
মা-বোনের জন্য উপহার কিনতে পারি না,
শুধু লিখে যাই — যতক্ষণ শ্বাস আছে।
৪. মধ্যযুগীয় ছায়া
পুরনো পাণ্ডুলিপির পাতায় ধুলো জমে,
রাউলির নামে আমি ইতিহাস গড়ে তুলি।
কেউ বলে জাল, কেউ বলে অলৌকিক,
আমি শুধু লিখি — যা হৃদয় বলে দেয়।
৫. অপূর্ণ খ্যাতির কবি
“মার্ভেলাস বয়” — পরে যারা বলবে,
আজ আমি মরে যাচ্ছি নীরবে, একা।
প্রতিভা যখন সময়ের আগে আসে,
তখন সমাজ তাকে চিনতে পারে না।
৬. কীটসের স্বপ্নে রাউলি
অনেক পরে এক কবি আমার নাম নেবে,
“Endymion” লিখে আমাকে স্মরণ করবে।
আমার ছদ্ম-মধ্যযুগ আমার মৃত্যুর পর,
অন্যের কবিতায় চিরজীবী হয়ে উঠবে।
৭. ব্রিস্টলের পুরনো চার্চ
সেন্ট মেরি রেডক্লিফের দেওয়ালে নাম লেখা,
আমার পূর্বপুরুষেরা যেখানে ঘুমায়।
আমি সেখানে বসে প্রাচীন কথা শুনি,
যা কেউ শোনে না, যা শুধু আমার।
৮. আত্মহত্যার রাত
জানালা দিয়ে চাঁদের আলো পড়ে ঘরে,
কাগজ ছিঁড়ে ফেলি — সব লেখা শেষ।
আর্সেনিকের তিক্ত স্বাদ মুখে,
চোখ বুজে দেখি — মধ্যযুগের স্বপ্ন।
৯. প্রতিভার অভিশাপ
যে খুব তাড়াতাড়ি দেখে সবকিছু,
তাকে সময় খুব তাড়াতাড়ি নিয়ে যায়।
প্রতিভা যখন অভিশাপ হয়ে ওঠে,
তখন মৃত্যুই একমাত্র মুক্তির গান।
১০. চিরন্তন যৌবনের কবি
আমি মরে গেছি, কিন্তু কবিতা বেঁচে আছে,
রাউলির নামে, কীটসের স্বপ্নে, শেলির কণ্ঠে।
সতেরো বছরের যৌবন চিরকাল থেকে যায়,
যারা অপূর্ণ থেকে যায়, তারাই অমর হয়।
ট্র্যাজিক কিশোর প্রডিজি — যার ছদ্ম-মধ্যযুগীয় কবিতা কীটসকে অনুপ্রাণিত করেছিল
টমাস চ্যাটারটন ছিলেন ইংরেজ সাহিত্যের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও বেদনাদায়ক প্রতিভাদের একজন। মাত্র ১৭ বছর ৯ মাস বয়সে আত্মহত্যা করে তিনি জীবন শেষ করেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট “টমাস রাউলি” (Thomas Rowley) নামক কাল্পনিক ১৫শ শতাব্দীর সন্ন্যাসীর ছদ্ম-মধ্যযুগীয় কবিতাগুলো পরবর্তীকালে রোমান্টিক যুগের কবিদের, বিশেষ করে জন কীটসকে, গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ জালিয়াত (forger) যিনি নিজের প্রতিভা দিয়ে ইতিহাস ও কবিতাকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন, এবং একজন ট্র্যাজিক প্রতিভা যিনি দারিদ্র্য ও অবহেলায় পরাজিত হয়েছিলেন।
শৈশব ও পরিবার (১৭৫২–১৭৬০)
টমাস চ্যাটারটন জন্মগ্রহণ করেন ২০ নভেম্বর ১৭৫২ সালে ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে। তাঁর পিতা টমাস চ্যাটারটন সিনিয়র ছিলেন স্কুলশিক্ষক, সঙ্গীতজ্ঞ ও মুদ্রা সংগ্রাহক, কিন্তু ছেলের জন্মের তিন মাস আগেই মারা যান। মা সারা চ্যাটারটন ও বড় বোন মেরি (পরবর্তীতে নিউটন) তাঁকে লালন-পালন করেন। পরিবার প্রজন্ম ধরে সেন্ট মেরি রেডক্লিফ চার্চের সেক্সটনের দায়িত্ব পালন করত।
শৈশব থেকেই চ্যাটারটন অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন। তিনি খুব অল্প বয়সে পড়তে শেখেন — পুরনো বইয়ের আলোকিত অক্ষর থেকে। মা বলতেন, তিনি “আলোকিত অক্ষরগুলোর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন”। তিনি ছোট বই পছন্দ করতেন না, বড় বড় প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও ইতিহাসের বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।
শিক্ষা ও প্রাথমিক সাহিত্যিক আগ্রহ
তিনি এডওয়ার্ড কলস্টনের দাতব্য বিদ্যালয়ে (Colston’s Hospital) পড়াশোনা করেন। সেখানে শিক্ষক টমাস ফিলিপস তাঁকে কবিতা লিখতে উৎসাহ দেন। চ্যাটারটন পকেট মানি দিয়ে লাইব্রেরি থেকে বই ধার করতেন এবং স্থানীয় সংগ্রাহকদের কাছ থেকে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি দেখতেন। তিনি চসার, স্পেনসার ও প্রাচীন ইতিহাসের বই পড়তেন।
১১ বছর বয়সেই তিনি Felix Farley’s Bristol Journal-এ লেখা শুরু করেন। প্রথমদিকে ধর্মীয় কবিতা লিখতেন, পরে মধ্যযুগীয় শৈলী অনুকরণ করে কবিতা তৈরি করতে শুরু করেন।
টমাস রাউলি ও ছদ্ম-মধ্যযুগীয় কবিতা
চ্যাটারটনের সবচেয়ে বড় সৃষ্টি হলো কাল্পনিক ১৫শ শতাব্দীর সন্ন্যাসী টমাস রাউলি (Thomas Rowley)। তিনি রাউলির নামে প্রাচীন কবিতা, ইতিহাস ও পত্র লিখতে শুরু করেন। এগুলো আসলে তাঁর নিজের রচনা — প্রাচীন ইংরেজি (Middle English) শৈলী অনুকরণ করে তৈরি করা জালিয়াতি।
তিনি জন কার্সির অভিধান থেকে পুরনো শব্দ সংগ্রহ করে “রাউলিয়ান” ভাষা তৈরি করেছিলেন। বিখ্যাত কবিতাগুলোর মধ্যে আছে “Elinoure and Juga”, “The Ryse of Peyncteynge yn Englade” ইত্যাদি। তিনি এগুলো ব্রিস্টলের ধনী সংগ্রাহকদের (যেমন: উইলিয়াম ব্যারেট, জর্জ ক্যাটকট) কাছে “প্রাচীন পাণ্ডুলিপি” হিসেবে উপস্থাপন করতেন।
১৭৬৯ সালে তিনি বিখ্যাত লেখক হোরেস ওয়ালপোলকে কবিতা পাঠান। প্রথমে ওয়ালপোল মুগ্ধ হয়ে চিঠি লেখেন, কিন্তু পরে জানতে পারেন যে লেখক মাত্র ১৬ বছরের এক কিশোর এবং কবিতাগুলো জাল। ওয়ালপোল তখন চিঠি-যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এই ঘটনা চ্যাটারটনকে গভীরভাবে আঘাত করে।
লন্ডনে আগমন ও সংগ্রাম (১৭৭০)
১৭৭০ সালের এপ্রিলে চ্যাটারটন লন্ডনে চলে যান সাহিত্যিক সাফল্যের আশায়। তিনি রাজনৈতিক লেখা (Junius-এর অনুকরণে), ব্যঙ্গাত্মক কবিতা, গান ও নাটক লিখতে শুরু করেন। Town and Country Magazine, Middlesex Journal ইত্যাদিতে লেখা প্রকাশ করেন।
কিন্তু লন্ডনে তাঁর জীবন ছিল চরম দারিদ্র্যের। তিনি খুব কম টাকায় লেখা বিক্রি করতেন, অনেক সময় খাবার জোটাতে পারতেন না। তবু মা ও বোনের জন্য উপহার কিনতেন। তিনি লর্ড মেয়র উইলিয়াম বেকফোর্ড ও জন উইলকসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, কিন্তু স্থায়ী সাফল্য পাননি।
মৃত্যু ও আত্মহত্যা (২৪ আগস্ট ১৭৭০)
১৭৭০ সালের ২৪ আগস্ট, মাত্র ১৭ বছর ৯ মাস বয়সে, চ্যাটারটন লন্ডনের ব্রুক স্ট্রিটের একটি অ্যাটিক ঘরে আর্সেনিক খেয়ে আত্মহত্যা করেন। তিনি নিজের লেখা ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি একটি “Last Will and Testament” লিখেছিলেন, যা ব্যঙ্গাত্মক হলেও গভীর হতাশা প্রকাশ করে।
তাঁকে প্রথমে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে অনেক কিংবদন্তি তৈরি হয়।
মরণোত্তর স্বীকৃতি ও রোমান্টিক কবিদের প্রভাব
চ্যাটারটনের মৃত্যুর পর তাঁর রাউলি কবিতাগুলো নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ১৭৭৭ সালে টমাস টিরহুইট Poems, supposed to have been written at Bristol, by Thomas Rowley সম্পাদনা করেন। প্রথমে অনেকে এগুলোকে প্রাচীন বলে মনে করেছিলেন, পরে প্রমাণিত হয় যে এগুলো চ্যাটারটনের নিজের রচনা।
তাঁর মৃত্যু ও প্রতিভা রোমান্টিক কবিদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে:
- উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁকে “the marvellous Boy” বলে অভিহিত করেন Resolution and Independence-এ।
- স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ লেখেন “Monody on the Death of Chatterton”।
- জন কীটস তাঁকে “the purest writer in the English language” বলে প্রশংসা করেন এবং Endymion কবিতাটি চ্যাটারটনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন।
- পার্সি বিশ শেলি Adonais-এ তাঁকে “inheritors of unfulfilled renown”দের একজন বলে উল্লেখ করেন।
সাহিত্যিক শৈলী ও উত্তরাধিকার
চ্যাটারটনের রাউলি কবিতাগুলোতে মধ্যযুগীয় ভাষা, ছন্দ ও চিত্রকল্পের অসাধারণ অনুকরণ ছিল। তিনি ইতিহাস, কল্পনা ও কবিতাকে মিশিয়ে এক অনন্য জগৎ তৈরি করেছিলেন। তাঁর জালিয়াতি শুধু প্রতারণা নয়, বরং এক ধরনের সৃজনশীল পুনর্নির্মাণ ছিল।
আজ তিনি ইংরেজ সাহিত্যের ট্র্যাজিক প্রতিভার প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় — যিনি অল্প বয়সেই অসাধারণ কাজ করে গেছেন, কিন্তু সমাজ ও দারিদ্র্য তাঁকে চিনতে পারেনি। তাঁর জীবন ও মৃত্যু রোমান্টিক আদর্শের (genius, suffering, unfulfilled potential) একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।