কবিতার ক্লাসঘর

Thomas Gray (১৭১৬–১৭৭১)

Thomas Gray ইংরেজ কবি, Pre-Romantic যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি খুব বেশি কবিতা লেখেননি — মোটামুটি ৮-১০টি উল্লেখযোগ্য রচনা আছে। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা Elegy Written in a Country Churchyard

১. Elegy Written in a Country Churchyard

ক্লান্ত দিনের শেষের ঘন্টাধ্বনি বাজে,
বন্ধুর পাহাড়ী উপত্যকা ছুয়ে হাওয়া ধীরে বয়ে যায় ঘাসপ্রান্তরে,
ক্লান্ত চাষা ধীর পায়ে ফিরে আসে ঘরে,
আমাকে ও পৃথিবীকে অন্ধকারে ছেড়ে যায়।

দৃষ্টি হতে সরে যায় প্রকৃতির রূপছায়া,
চারদিকে নীরবতা, স্তব্ধ বিশাল আকাশ,
পতঙ্গ পাখার গুনগুন ধ্বনি থামে,
গলার ঘন্টাধ্বনি তুলে মেষপাল খোজে রাতের নিবাস।

অদূরে আইভি ঝোপে নিজেকে লুকিয়ে রেখে
চাঁদের বিরুদ্ধে পেঁচা ভ্রু কুটি করে
ছায়াময় নিজের পুরনো কোটরে থেকে আদিম
সে পেঁচা মিটমিটে চোখে নিজের অঞ্চলে ঘুরে ফিরে।

ম্যাপল গাছের ছায়া আর রুক্ষ মৃত্তিকার পানে,
পুরনো সমাধির মনোরম কারুকাজ যেন সবলে টানে।

কবরের স্বল্প পরিসরে গ্রামের প্রপিতামহেরা,
ঘুমিয়ে রয়েছে নিরালায় নীরব কবরস্থানে,
ভোরের হাওয়া তাদের মৃদুস্বরে ডাকে,
খড়ের বাসায় চড়াই পাখিরা শব্দ করে,
মোরগের চিৎকার কিংবা শিঙ্গার ধ্বনি,
কেউ পারবে না জাগাতে তাদের পাতাল গহবর থেকে।

উষ্ণতার জন্য তাদের তরে কেউ জ্বালবে না আগুন,
গৃহবধুরা সন্ধ্যায় ব্যস্ত হবে না তাদের সেবায়;
কোনো দিন তারা ঘরে ফিরে শিশুদের সাথে করবে না মিষ্টালাপ,
শিশুরা কোনো দিন তাদের কোলে বসে চুমু দেবে না মমতায়।

একদা এই মানুষেরা পাকা শস্য কেটেছে কাঁচিতে।
লাঙলে চষেছে তারা একদা কঠিন মৃত্তিকা,
চালনা করেছে তাদের ঘোড়া আর ষাড় সুচারু দক্ষতায়:
কঠিন কুঠারাঘাতে বৃক্ষ কেটে তারা ফেলেছে জমিনে!

কোনো উৎসাহী জন আজ এতটুকু শ্রম দেবে না তাদের খুশির তরে!
বড়লোকেরা শুনবে এইসব দুঃখীজনদের কাহিনী,
আর মুখ ফিরিয়ে নেবে চরম অবজ্ঞার হাসি হেসে।

টমাস গ্রে (Thomas Gray, ১৭১৬–১৭৭১)

একজন ইংরেজ কবি, পণ্ডিত ও চিঠিপত্র

টমাস গ্রে ইংরেজ সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তিনি ছিলেন আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ের সবচেয়ে সম্মানিত কবি, যদিও তিনি জীবদ্দশায় মাত্র তেরোটি কবিতা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা “Elegy Written in a Country Churchyard” (একটি গ্রামীণ গির্জার প্রাঙ্গণে লেখা এলিজি) ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক উদ্ধৃত কবিতাগুলোর একটি। গ্রে ছিলেন প্রি-রোমান্টিক যুগের অন্যতম প্রধান কবি, যিনি আগস্টান যুগের শৃঙ্খলাবদ্ধ শৈলী ও রোমান্টিক যুগের আবেগ-অনুভূতি, প্রকৃতি ও মেলানকোলির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত সংবেদনশীল, লাজুক, পাণ্ডিত্যপূর্ণ ও আত্মসমালোচক ব্যক্তি।

শৈশব ও পারিবারিক জীবন (১৭১৬–১৭২৫)

টমাস গ্রে জন্মগ্রহণ করেন ১৭১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর লন্ডনের কর্নহিল (Cornhill) এলাকায়, ৪১ নম্বর বাড়িতে। তাঁর মা ডোরোথি অ্যান্ট্রোবাস (Dorothy Antrobus) একজন মিলিনার (মাথার টুপি ও পোশাকের দোকানদার) ছিলেন। বাবা ফিলিপ গ্রে (Philip Gray) ছিলেন একজন মানি-স্ক্রাইভেনার (অর্থ-লেনদেন ও দলিল-লেখক)।

গ্রের বাবা-মায়ের দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত অশান্ত। বাবা ছিলেন হিংস্র, মানসিকভাবে অসুস্থ ও সহিংস। তিনি স্ত্রীকে নির্যাতন করতেন। গ্রে ছিলেন বাবা-মায়ের বারো সন্তানের মধ্যে পঞ্চম এবং একমাত্র জীবিত সন্তান (কেউ কেউ বলেন আট সন্তানের মধ্যে একমাত্র)। শৈশবে তিনি প্রায় মারা যাচ্ছিলেন — শ্বাসরোধের মতো অবস্থা হয়েছিল। মা তাঁর হাত কেটে রক্তপাত ঘটিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন।

মা ডোরোথি ছিলেন অসাধারণ সাহসী ও কর্মঠ। স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি আলাদা হয়ে যান এবং নিজের মিলিনারির দোকান চালিয়ে ছেলের শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করেন। গ্রে পরবর্তীকালে মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পোষণ করতেন।

ইটন কলেজ: বন্ধুত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ (১৭২৫–১৭৩৪)

১৭২৫ সালে মাত্র আট বছর বয়সে গ্রেকে ইটন কলেজে (Eton College) পাঠানো হয়। এর পেছনে কারণ ছিল তাঁর মামারা — রবার্ট অ্যান্ট্রোবাস ও উইলিয়াম অ্যান্ট্রোবাস — ইটন ও কেমব্রিজের শিক্ষক ছিলেন। রবার্ট মামা গ্রের মধ্যে উদ্ভিদবিজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণমূলক বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন।

ইটনে গ্রে একজন সূক্ষ্ম, লাজুক ও পাঠ্যবিমুখ ছাত্র ছিলেন। তিনি খেলাধুলা এড়িয়ে চলতেন এবং পড়াশোনা, কবিতা ও ক্লাসিক্যাল সাহিত্যে মগ্ন থাকতেন। এখানেই তিনি তিনজন আজীবন বন্ধু পান — হোরেস ওয়ালপোল (Horace Walpole, পরবর্তীকালে বিখ্যাত লেখক ও স্ট্রবেরি হিলের স্রষ্টা), রিচার্ড ওয়েস্ট (Richard West, প্রতিভাবান তরুণ কবি) ও টমাস অ্যাশটন (Thomas Ashton)।

তারা চারজন মিলে “Quadruple Alliance” নামে পরিচিত হয়। তারা নিজেদের মধ্যে কাব্যিক ডাকনাম ব্যবহার করতেন — গ্রে “ওরোজমেডেস”, ওয়ালপোল “সেলাডন”, ওয়েস্ট “ফেভোনিয়াস”। এই বন্ধুত্ব গ্রের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে রিচার্ড ওয়েস্টের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আবেগপূর্ণ।

কেমব্রিজ ও গ্র্যান্ড ট্যুর (১৭৩৪–১৭৪১)

১৭৩৪ সালে গ্রে পিটারহাউস কলেজ (Peterhouse), কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি লাতিন ও গ্রিক সাহিত্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং লাতিন ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম তাঁকে বিরক্ত করত। ১৭৩৮ সালে তিনি ডিগ্রি না নিয়েই কেমব্রিজ ছেড়ে দেন এবং আইন পড়ার জন্য ইনার টেম্পলে যাওয়ার কথা ভাবেন।

১৭৩৯ সালে হোরেস ওয়ালপোল তাঁকে ইউরোপের গ্র্যান্ড ট্যুর-এ সঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ জানান। ২৯ মার্চ ১৭৩৯-এ তারা ডোভার থেকে যাত্রা শুরু করেন। ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও ইতালি ভ্রমণ করেন। গ্রে ফরাসি নাটক (বিশেষ করে রাসিন), ইতালীয় সাহিত্য (দান্তে, তাসো) ও স্থাপত্য নিয়ে গভীর আগ্রহ দেখান।

১৭৪১ সালে ইতালির রেজিওতে দুজনের মধ্যে তীব্র ঝগড়া হয়। কারণ ছিল ওয়ালপোলের পার্টি-প্রেমী স্বভাব ও গ্রের প্রত্নতাত্ত্বিক ও গভীর চিন্তাশীল স্বভাবের পার্থক্য। গ্রে একা ভ্রমণ শেষ করে ১৭৪১ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডনে ফিরে আসেন। পরবর্তীকালে ১৭৪৫ সালে তারা পুনর্মিলিত হন।

সাহিত্যিক জীবনের সূচনা ও ১৭৪২ সালের উৎপাদনশীলতা

১৭৪১ সালে বাবার মৃত্যুর পর গ্রে মায়ের সঙ্গে স্টোক পোগেস (Stoke Poges), বাকিংহামশায়ারে গ্রীষ্ম কাটাতে শুরু করেন। ১৭৪২ সাল ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সৃজনশীল সময়। এ বছর তিনি “Ode on the Spring”, “Hymn to Adversity”, “Ode on a Distant Prospect of Eton College” প্রভৃতি লেখেন।

সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ১৭৪২ সালে প্রিয় বন্ধু রিচার্ড ওয়েস্টের অকালমৃত্যুতে (মাত্র ২৫ বছর বয়সে)। এই শোক গ্রেকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি “Sonnet on the Death of Richard West” লেখেন।

“Elegy Written in a Country Churchyard” — রচনার ইতিহাস

“Elegy” গ্রের সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা। এটি সম্ভবত ১৭৪২ সাল থেকে লেখা শুরু হয় এবং ১৭৫০ সাল নাগাদ শেষ হয়। স্টোক পোগেস গির্জার প্রাঙ্গণ (যেখানে তাঁর মা ও খালা সমাহিত) এই কবিতার অনুপ্রেরণা বলে মনে করা হয়।

১৭৫০ সালের ১২ জুন গ্রে কবিতাটি হোরেস ওয়ালপোলের কাছে পাঠান। ওয়ালপোল অত্যন্ত প্রশংসা করেন এবং লন্ডনের সাহিত্যমহলে ছড়িয়ে দেন। ১৭৫১ সালের ফেব্রুয়ারিতে চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গ্রে বাধ্য হয়ে কবিতাটি প্রকাশ করেন। এটি তাৎক্ষণিকভাবে সাফল্য লাভ করে — কয়েক মাসের মধ্যে চারটি সংস্করণ বিক্রি হয়। “The paths of glory lead but to the grave”, “Some mute inglorious Milton here may rest” — এই পঙ্‌ক্তিগুলো ইংরেজি ভাষায় চিরস্থায়ী হয়ে যায়।

অন্যান্য রচনা ও প্রকাশনা

গ্রে ছিলেন আত্মসমালোচক ও নিখুঁতবাদী। তিনি খুব কম লিখতেন এবং প্রকাশ করতেন। উল্লেখযোগ্য রচনা:

  • Ode on the Death of a Favourite Cat (হালকা, হাস্যরসাত্মক)
  • The Progress of PoesyThe Bard (Pindaric ওড, ১৭৫৭)
  • The Fatal SistersThe Descent of Odin (নর্স পুরাণ থেকে অনুবাদ)

১৭৫৭ সালে তাঁকে পোয়েট লরিয়েট (Poet Laureate) করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

কেমব্রিজের জীবন, ব্যক্তিগত স্বভাব ও শেষ বছরগুলি

গ্রে ১৭৪২ সাল থেকে প্রায় সারাজীবন কেমব্রিজে কাটান। ১৭৫৬ সালে পিটারহাউসের কিছু দুষ্টু ছাত্র মিথ্যা অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্ক তৈরি করে তাঁকে ভয় দেখায় (কিছু সূত্রে বলা হয় তাঁকে জল ঢেলে দেওয়া হয়)। এরপর তিনি পেমব্রোক কলেজে চলে যান।

১৭৬৮ সালে তিনি রেজিয়াস প্রফেসর অফ মডার্ন হিস্ট্রি নিযুক্ত হন (বেতন ৪০০ পাউন্ড, কিন্তু তিনি কখনো বক্তৃতা দেননি — এটি ছিল সাইনকিউর)।

গ্রে ছিলেন হাইপোকন্ড্রিয়াক (অতিরিক্ত স্বাস্থ্য-সচেতন), লাজুক, সংবেদনশীল ও একাকী। তিনি কখনো বিয়ে করেননি। তাঁর ঘনিষ্ঠ পুরুষ বন্ধুত্ব (বিশেষ করে রিচার্ড ওয়েস্ট ও পরবর্তীকালে তরুণ সুইস অভিজাত চার্লস ভিক্টর দ্য বনস্টেটেনের সঙ্গে) আধুনিক গবেষকরা সমকামী প্রবণতার ইঙ্গিত বলে মনে করেন। তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞান, স্থাপত্য, ইতিহাস, নর্স ও ওয়েলশ সাহিত্যে গভীর আগ্রহী ছিলেন।

মৃত্যু ও সমাধি

১৭৭১ সালের ৩০ জুলাই কেমব্রিজে গ্রে মৃত্যুবরণ করেন (গাউট বা সংশ্লিষ্ট অসুস্থতায়)। মাত্র ৫৪ বছর বয়সে। তাঁকে স্টোক পোগেস গির্জার প্রাঙ্গণে মায়ের পাশে সমাহিত করা হয় — যে স্থানটি তাঁর “Elegy” কবিতার সঙ্গে চিরকাল যুক্ত হয়ে আছে। ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয় ১৭৭৮ সালে।

উত্তরাধিকার

টমাস গ্রে ছিলেন তাঁর যুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি। তাঁর “Elegy” শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাঠকদের হৃদয় স্পর্শ করে চলেছে। তিনি রোমান্টিক আন্দোলনের (Wordsworth, Coleridge প্রমুখ) পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর চিঠিপত্র (Letters) ইংরেজি গদ্যসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।

আজও Thomas Gray Archive তাঁর রচনা ও জীবন নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, অল্প লিখলেও যদি তা নিখুঁত ও হৃদয়স্পর্শী হয়, তবে তা চিরকাল বেঁচে থাকে।

“The curfew tolls the knell of parting day…” — এই পঙ্‌ক্তি দিয়ে শুরু হওয়া কবিতা আজও লক্ষ লক্ষ পাঠককে মৃত্যু, নম্রতা ও অজানা প্রতিভার কথা ভাবতে বাধ্য করে।

টমাস গ্রে ছিলেন সত্যিকার অর্থেই এক “mute inglorious” নন — তিনি ছিলেন একজন অমর কণ্ঠস্বর।

0 Comments

প্রতিটি অপেক্ষার মূল্য অনেক ...