১৮৯৯ সাল, চৈত্র মাস। চারপাশের প্রকৃতিতে যখন রঙের মেলা, হেমাঙ্গিনীর পৃথিবীতে তখন কেবলই বিবর্ণ হাহাকার। দালানের খসে পড়া ইটের প্রাচীরে হেলান দিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে নিথর হয়ে। কাঠফাটা রোদ এসে পড়েছে ভুবনের চাদর গায়ে জড়ানো রুক্ষ কাঁধে। আজই তার কাজের খোঁজে কলকাতা শহরে পাড়ি দেওয়ার কথা।
—আমি তাহলে এ তল্লাট ছেড়ে যাচ্ছি হেমাঙ্গিনী।
—যাবেন। আপনার চলার পথ আটকানোর সাধ্য কি আর এই নগণ্য মানবীর আছে?
—শহরে বেঁচে থাকার লড়াইটা খুব কঠিন হবে। আমার মতো একজন সর্বহারা পুরুষের পক্ষে অভাবের সংসারে তোমায় খামোখা কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া চলে না।
—আমি আপনার কাছে কোনো দলিলে সই করা মিথ্যে প্রতিশ্রুতি তো কোনো দিনও চাইনি ভুবন বাবু।
—তবুও আমার জন্য আশা রেখো না। দারিদ্র্য মানুষের সুন্দর অনুভূতির গলা খুব নির্মমভাবেই টিপে মারে। নিজের খেয়াল রেখো।
—আপনিও।
ভুবন আর দ্বিতীয় মুহূর্ত দাঁড়াল না সেখানে। অধিকার ফলানোর মতো মেকি কোনো আশ্বাস বা পিছু ফিরে তাকানোর সামান্য আদিখ্যেতাও সে আজ দেখাল না। তার মলিন চটির খসখস শব্দটা মেঠো পথের শুকনো ধুলোয় নিমেষেই তলিয়ে গেল। হেমাঙ্গিনী চোখের জল ফেলল না। সে বাস্তবতায় অভ্যস্ত মেয়ে; সে ভালো করেই বোঝে, যে পুরুষের কাঁধে বিধবা বোন আর রুগ্ন মায়ের অন্ন জোটানোর দায় থাকে, তার কাছে প্রেম নেহায়েত এক হাস্যকর বিলাসিতা। হেমাঙ্গিনীর বুকের বাম পাশ চিরে কেবল একটা নীরব দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। চৈত্র মাসের এই রুক্ষ হাওয়ায় জীর্ণ পাতার মতোই নিঃশব্দে ফুরিয়ে গেল ওর জীবনের শেষ বসন্তটা।
{সমাপ্ত}