খেয়া ঘাটের মাঝিআশ্বিনের শেষভাগ, ১৮৯৯ সাল। ধলেশ্বরীর ঘোলা জলে তখন গোধূলির বিষণ্ণ ছায়া নিবুনিবু করছে। কালু মাঝির জরাজীর্ণ নৌকাখানা ঘাটের খুঁটির সাথে মোটা কাছি দিয়ে বাঁধা। কাঠের ভেজা পাটাতনে পা গুটিয়ে বসে জরীনা শাড়ির রুক্ষ আঁচলে নিঃশব্দে গাম মুছল। অভাব আর জমিদারের অত্যাচারে বাপ-দাদার ভিটেটুকু চিরতরে ছাড়তে হচ্ছে আজ।
—তর তো আজই যাওনের কতা আছিল না জরীনা।”
—দিনক্ষণ কি আর গরিবের হাতে বন্দি থাকে কালু ভাই? কপালে যেইডা আছিল, সেইডাই তো হইলো।”
—ওপারে গিয়া কি সত্যি পেট ভরবো? ওই অচিন শহরে তোমগো কেউ চিনে?”
—চিন্যা কী অইবো! এখানে পইড়া থাকলে ক্ষিদায় শুকাইয়া মরতে অইতো। এর চাইতে বাইচ্যা থাকার লাইগ্যা না হয় অজানার লগেই হাইট্টা দেখি।”
কালু মাঝি আর কোনো প্রতিবাক্য ছুঁড়ল না। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা অদ্ভুত কষ্টটাকে নীরবে গিলে নিল সে। গরিব মানুষের অধিকার খাটাতে নেই, বুক চিরে কেবলই দীর্ঘশ্বাস জন্ম নেয় তাদের। জরীনার দিকে একবারও সরাসরি না তাকিয়ে কালু কাছি খুলে হাতে বৈঠা তুলে নিলো। জলের বুকে দাঁড়ের প্রথম টান পড়তেই ছলাৎ করে এক অবর্ণনীয় বিষাদের সুর বাজল। নদীর এপার থেকে ওপারে শুধু অভাবী শরীরগুলোই যায়, কিন্তু বুকের ভেতরের জমানো গুমোট শূন্যতা আর নিঃশব্দ ক্রন্দনটুকু চিরকাল পড়ে থাকে এই ভাঙা ঘাটেই। কালুর হৃদয়ে কোনো রূপকথা টিকল না, থেকে গেল স্রেফ নিয়তির কাছে চূড়ান্ত এক নিরুপায় সমর্পণ।
{সমাপ্ত}