সম্প্রীতির উৎসব ছাতা পরব
বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল
কথায় আছে ” বার মাসে তের পারবন “। বাংলার ঋতু বৈচিত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নানা মেলা, পরব, পালি, ব্রত উদযাপিত হয়ে আসছে আবাহমান কাল থেকে। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী কিছু মেলা, পারবন, পরব অবলুপ্তির পথে পা বাড়িয়েছে।
ভারত তথা পশ্চিম বঙ্গের পুরুলিয়া জেলা পশ্চিম বঙ্গে এক বিশেষ জেলা হেসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে তার প্রাকৃতিক দৃশ্য ও লৌকিক উৎসবের জন্য। সেই রকমই একটা লৌকিক উৎসব হল ছাতা পরব।
ছাতা পরবের নাম শুনলে যারা এ বিষয়ে জানেন না, সেই সব মানুষজনের মনে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, ছাতা পরব মানে ছাতার কোন বড় মেলা বা শুধু ছাতা বা ছাতা বিষয়ক আয়োজিত উৎসবের অনুষ্ঠান। বই মেলায় যেমন প্রচুর বই পাওয়া যায়, ছাতা পরবের মেলায় বিভিন্ন ধরনের রঙ বেরঙের ছাতা হয়তো পাওয়া যাবে সস্তা দামে ? ছাতা পরব কিন্তু কোন ছাতা বিক্রির মেলা নয়। এই মেলায় পূজোর নিমিত্তে বাঁশের ছাতার মতো আদলে নূতন কাপড় জড়ানো হয়, সেই ছাতাটি পূজো হলে ছাতা আকাশে তোলা হয়। হাতলের বদলে লম্বা কাঁচা বাঁশ। ১৯৪০ সালের আগে থেকেই এই মেলা আমাদের গ্রামে হয়ে আসছে। সঠিক কবে শুরু হয় সেই দিন তারিখে যাওয়া যাবে না। আগে দিনে কিন্তু বাঁশের তৈরি ছাতাই তোলা হত। পরিবর্তন হতে হতে এখন হালকা ছাতার আদলে এসে ঠেকেছে। নীচে আগের দিনে যেরকম ছাতার ব্যবহার হত তার একটা ছবি দিলাম।
ছাতা পরবের সঙ্গে কিছুটা ইঁদ পরবের সাদৃশ্য থাকায় অনেকে ছাতা পরবের সাথে ইঁদ পরবকে গুলিয়ে ফেলেন। ছাতা পরব সম্পূর্ণ একটা আলাদা পরব। যদিও আরাধ্য দেবতা এক ‘ দেব রাজ ইন্দ্র ‘ । তবে সময় এক নয়, মেলা প্রাঙ্গণের নামও এক নয়। ইঁদ পরবের স্থান কে ” ইঁদ ট্যাঁড় ” বলা হয় অন্য দিকে ছাতা পরবের স্থান কে ” ছাতা মাড়া ” বা ” ছাতা ট্যাঁড় ” বলার রীতি। ছাতা পরবের ব্যখ্যা দিন দিন লোক মুখে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। আসল তথ্যের অভাবে বিভিন্ন মত শোনা যাচ্ছে।
আধুনিক মতে ইংরেজদের অত্যাচারে তৎকালীন মানভূমের পঞ্চকোট রাজ্যের রাজা এবং প্রজারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। তাই রাজা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন। এই যুদ্ধে রাজার সৈন্য ছাড়াও সাধারণ প্রজারা সম্মিলিত শক্তিতে ইংরেজদের পরাস্ত করে। সেই প্রথম রাজা ও প্রজাগণ এক ছাতার তলায় এসেছিলেন বলে যুদ্ধ জয়ের পর রাজা বিশেষ ছাতা উঠিয়ে এক হয়ে লড়াই বার্তা দেন ও পরে বিজয় উৎসব পালন করেন।
প্রাচীন মতে জনপ্রিয় লোক উৎসব ছাতা পরবের সঙ্গে ভারতীয় পুরাণ লোক কথা, ফসল সন, আঞ্চলিক ইতিহাস ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত। প্রায় ৫০০ বছর পূর্ব থেকে ৩১ শা ভাদ্র সংক্রান্তি অর্থাৎ ভাদুর জাগরণের পরের দিন ছাতা পরব হয়ে আসছে। ১লা আশ্বিন পূর্বতন দিনে বাংলা দেশে যে ফসলী সন চালু ছিল।
প্রাচীন প্রথা মেনে পঞ্চকোট রাজপরিবার ও তাঁর অধিনস্থ জমিদার, মৌজাদার এই পরব করতেন। গদীবেড়ো গ্রাম কাশীপুর রাজ স্টেটের অধিনস্ত গ্রাম। কাশি পুর রাজার কুল গুরু অধিষ্ঠিত এলাকা। রাজা গুরু কুলের উদ্দেশ্যে একশত সাড়ে সাতান্ন মৌজা দান করে ছিলেন।
সেই সূত্রে মৌজাদারের সকল পালনীয় নিয়ম মানা হয়ে আসছে সেই আদ্দি কাল হোতে। বর্তমান সময়ে জমিদার, মৌজাদার প্রথা আর নেই তবু ঐতিহ্য রক্ষা অনুযায়ী নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও অনুষ্ঠানটি পালিত হচ্ছে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায়।
এই ছাতা আসলে আসলে শষ্যোৎসব, বৃক্ষ পূজার উৎসব, রাজার আধিক্য বিস্তার, সম্পদ বৃদ্ধি, শষ্যবৃদ্ধি যুদ্ধ জয়ের বাসনাকে প্রজাদের মনে জারিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতেন।
এখনও পুরুলিয়া শহরের অনতি দূরে চাকোলতোড় মাঠে সারারাত ধরে নাচ, গান, হৈ হুলোড়ের মধ্য দিয়ে ছাতা পরব পালিত হয় ।
কাশিপুরের পার্বণ
চাকলতোড়ের ছাতারে।
কাশিপুরের পার্বণ
জয়পুরের রাস রে।
কাশিপুরের গোরুর হাট
বেড়োর ছাতারে
আরো আছে বেড়োর বাঁধ
কেশব চাঁদ, চণ্ডী থান
দেখতে পাবেরে।
পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর থানার অন্তর্গত গদীবেড়ো ও পুরাতন বেড়ো গ্রামের পাশে ছাতা মাড়ায়, ছাতা পরবের কিছু ছবি। ঐতিহ্য অনুযায়ী আজও ছাতা উঠে, পূজো হয়, মেলাও বসে। কিন্তু আগের জৌলুস আর নেই। হয়তো একদিন কালের অতলে সবই হারিয়ে যাবে।স্থানীয় মানুষজন ঐকান্তিক চেষ্টা করে চলেছেন ঐতিহ্য রক্ষা করার। জায়গার নামকরণ হয়েছে ” ছাতামাড়া “। পাশে পুরাতন বেড়ো প্রাথমিক বিদ্যালয় ” ছাতামাড়ার স্কুল ” নামে অধিক পরিচিত, একটা টিউব ওয়েল থেকে প্রচুর পানীয় জল সরবাহিত হয়। কলটির নাম হয়েছে মুখে মুখে ” ছাতামাড়ার কল “। স্থানীয় কুমোর বাড়িতে তৈরি মাটির
খেলনা, রঙ বেরঙের বেলুন, মনহারি দ্রব্য, কমলা বা মৌটবা,পেয়ারা, ঘুঘনী, ফুচকা, চাট, এবং ভাদুর জাগরনের উদ্দেশ্য করে তৈরি মিষ্টান্ন দ্রব্য যেমন খাজা, গজা, বালুসাঁই, লবঙ্গ লতিকা, লাড্ডু ও জেলাপি, তেলে ভাজা যেমন চপ, সিঙ্গাড়া, পৌকড়ি, ঝুড়ি ভাজা ইত্যাদি পাওয়া যায়।
মেলার একটা বিশেষ দিক হল হিন্দু – মুসলিম ছেলে মেয়েদের সম্প্রীতির মেল বন্ধন। স্থানীয় বংশগ্রাম বা বাঁশগা, ফুবেড়্যা, কলুর বাগিচা, রাইডি, বাগিচা, গদীবেড়ো, পুরাতন বেড়ো, খড়বনা, লাড়ুবাড়ি, পাঁচ পাহাড়ি থেকে রঙ বেরঙের পোষাক পরিহিত ছেলে মেয়েরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটে ছুটে আসে। পোড়া মাটির খেলনা, কমলা, পেয়ারা, মনহারি দ্রব্য, সাপ বেলুন খরিদ করে বাঁশি বাজিয়ে বাজিয়ে থৈলা ভর্তি জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ফেরে।
বিশাল পাথরের চাঁই রয়েছে। পাশা পাশি দুটি হনুমান বেদী মন্দির ও মা দুর্গার মন্দির অবস্থান করছে। উত্তর পূর্বে গদীবেড়ো পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্যপট সকলকে মোহিত করবেই ।
ছবি – সৌরভ নাথ,রাজেশ চন্দ্র, দেব পাল ও ফেসবুক বন্ধুদের থেকে সংগৃহীত।
কলমে – কবি সাহিত্যিক বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল, গদীবেড়ো।
– – – – () – – – –
ছেলের মেয়েরা সেজে গুজে চাকৈলতোড়ের ছাতা দেখতে যাওয়া কে কেন্দ্র করে জনৈক অমূল্য কুমার মহাশয়ের
লেখা ঝুমুর গান – – –
ভাদর মাসের আদর দিইনে
হামকে নাকের নোলক দেন্ কিইনে
তবে, মাথায় লিইব লাইলনের ফিতা
দেখইতে যাব চাকৈলতোড়ের ছাতা।
তবে, রঙচ্যঙ্গা শাড়ি লিইব
মুখে হি – – – – মানী লাগাইব
হাতে লিইব ফোল্ডিং এর ছাতা
দেখইতে যাইব চাকৈলতোড়ের ছাতা।
তবে চইখে চশমা, হাতে ঘড়ি
তার উপরে রেশমী চুড়ি।
পায়ে লিইব খুরী বাঁধা জুতা
দেখতে যাব চাকৈলতোড়ের ছাতা।
আর পায়ে আলতা গলায় হার
ঠোঁট রাঙা চাই হামার
ঠং দেইখেন অমূল্যর ধরে মাথা।
দেইখতে যাব চাকৈলতড়ের ছাতা।